ঢাকা, মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬, ৫ কার্তিক ১৪৩৩

জন্মনিবন্ধন অনলাইনে আবেদন করবেন যেভাবে, জানুন ধাপে ধাপে

জাতীয় ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ অক্টোবর ২০ ১৬:৩৮:২১
জন্মনিবন্ধন অনলাইনে আবেদন করবেন যেভাবে, জানুন ধাপে ধাপে

শিশুর জন্মনিবন্ধন কিংবা নিজের জন্মনিবন্ধন সনদের জন্য এখন ঘরে বসেই অনলাইনে আবেদন করা যায়। এ জন্য বাংলাদেশ সরকারের জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন তথ্যব্যবস্থার (BDRIS) ওয়েবসাইটে প্রবেশ করে নির্ধারিত ফরম পূরণ করতে হবে। তবে অনলাইনে আবেদন জমা দিলেই জন্মনিবন্ধন সম্পন্ন হয়ে যায় না। আবেদনপত্রের প্রিন্ট কপি ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংশ্লিষ্ট নিবন্ধকের কার্যালয়ে জমা দিতে হতে পারে। তাই আবেদন করার আগে কোন তথ্য দিতে হবে, কী কী নথি প্রস্তুত রাখা প্রয়োজন এবং আবেদন জমা দেওয়ার পর কী করতে হবে—এসব জানা জরুরি।

জন্মনিবন্ধন শিশুর পরিচয় প্রতিষ্ঠার গুরুত্বপূর্ণ সরকারি নথি। শিক্ষা, পাসপোর্টসহ বিভিন্ন নাগরিক সেবা গ্রহণে এ সনদ প্রয়োজন হতে পারে। নতুন জন্মনিবন্ধনের আবেদন করতে সরকারি ওয়েবসাইট ব্যবহার করাই সবচেয়ে নিরাপদ। আবেদনের সময় তথ্যের ভুল এড়ানোও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ চূড়ান্তভাবে জমা দেওয়ার আগে সব তথ্য যাচাই করে নেওয়ার নির্দেশনা সরকারি ফরমেই দেওয়া রয়েছে।

জন্মনিবন্ধনের অনলাইন আবেদনের সরকারি ওয়েবসাইট

নতুন জন্মনিবন্ধনের জন্য আবেদন করতে বাংলাদেশ সরকারের জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন সিস্টেমের নির্ধারিত পোর্টালে প্রবেশ করতে হবে।

অনলাইন আবেদন লিংক: https://bdris.gov.bd/br/application

এই ওয়েবসাইটে জন্মস্থান, স্থায়ী ঠিকানা অথবা বিদেশে অবস্থানকারীদের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ দূতাবাসের মাধ্যমে আবেদনের বিকল্প রয়েছে। আবেদনকারী কোন নিবন্ধন কার্যালয়ের অধীনে আবেদন করবেন, তা সঠিকভাবে নির্বাচন করতে হবে।

জন্মনিবন্ধনের অনলাইন আবেদন করার নিয়ম

অনলাইনে আবেদন করতে নিচের ধাপগুলো অনুসরণ করুন।

১. জন্মনিবন্ধনের ওয়েবসাইটে প্রবেশ করুন

প্রথমে https://bdris.gov.bd/br/application লিংকে প্রবেশ করুন। আবেদনটি কোথা থেকে করতে চান, তা নির্বাচন করতে বলা হবে। সাধারণত জন্মস্থান, স্থায়ী ঠিকানা এবং বাংলাদেশ দূতাবাস—এই বিকল্পগুলোর মধ্যে প্রযোজ্যটি বেছে নিতে হবে।

জন্মস্থান বা স্থায়ী ঠিকানার ভিত্তিতে আবেদন করার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট এলাকার নিবন্ধন কার্যালয় নির্বাচন করুন। ভুল কার্যালয় নির্বাচন করলে আবেদন প্রক্রিয়ায় জটিলতা তৈরি হতে পারে।

২. আবেদনকারীর পরিচিতি ও জন্মতারিখ লিখুন

এরপর নিবন্ধনাধীন ব্যক্তির নাম বাংলা ও ইংরেজিতে, জন্মতারিখ, লিঙ্গ এবং ফরমে চাওয়া অন্যান্য পরিচিতির তথ্য পূরণ করুন। নামের বানান ও জন্মতারিখ যেন নির্ভরযোগ্য নথির সঙ্গে মেলে, সেদিকে বিশেষ নজর দিন।

জন্মতারিখ লেখার সময় দিন, মাস ও বছরের ক্রম ঠিক আছে কি না যাচাই করুন। বাংলা ও ইংরেজি নামের বানানেও সামঞ্জস্য রাখা প্রয়োজন।

৩. জন্মস্থানের ঠিকানা পূরণ করুন

আবেদন ফরমে জন্মস্থানের দেশ, বিভাগ, জেলা, সিটি করপোরেশন বা উপজেলা, পৌরসভা বা ইউনিয়ন এবং প্রযোজ্য ওয়ার্ডের তথ্য দিতে হয়। পাশাপাশি ডাকঘর, গ্রাম, পাড়া বা মহল্লা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী বাড়ি ও সড়কের ঠিকানাও লিখতে হবে।

ঠিকানা পূরণের সময় সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রশাসনিক পরিচয় সঠিকভাবে নির্বাচন করুন। জন্মস্থানের তথ্য এবং স্থায়ী ঠিকানা এক না হলে উভয় জায়গার তথ্য আলাদাভাবে দিতে হবে।

৪. বাবা-মায়ের তথ্য দিন

ফরমে বাবা ও মায়ের নাম বাংলা ও ইংরেজিতে, জন্মতারিখ এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে তাঁদের জন্মনিবন্ধন নম্বর, জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর বা অন্যান্য পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য চাওয়া হতে পারে।

তথ্য পূরণের সময় বাবা-মায়ের নথিতে থাকা নামের বানান অনুসরণ করুন। তাঁদের জন্মনিবন্ধন নম্বর থাকলে সেটি সঠিকভাবে লিখুন এবং ওয়েবসাইটে যাচাইয়ের বিকল্প থাকলে নির্দেশনা অনুযায়ী যাচাই করুন।

৫. স্থায়ী ও বর্তমান ঠিকানা পূরণ করুন

জন্মস্থানের ঠিকানা, স্থায়ী ঠিকানা এবং বর্তমান ঠিকানা এক হলে ফরমে থাকা সংশ্লিষ্ট বিকল্প ব্যবহার করা যেতে পারে। ঠিকানা আলাদা হলে প্রতিটি অংশে যথাযথ তথ্য দিতে হবে।

আবেদনের সঙ্গে যুক্ত ঠিকানার প্রমাণপত্রও যেন দেওয়া তথ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়, তা নিশ্চিত করুন।

৬. আবেদনকারীর তথ্য ও প্রয়োজনীয় নথি যুক্ত করুন

নিবন্ধনাধীন ব্যক্তির পক্ষে কে আবেদন করছেন, তা ফরমে উল্লেখ করতে হবে। শিশু বা ১৮ বছরের কম বয়সী ব্যক্তির ক্ষেত্রে সরকারি ফরমে বাবা, মা, আইনানুগ অভিভাবক বা বিধি অনুযায়ী ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তির প্রত্যয়নের ব্যবস্থা রয়েছে।

এরপর ওয়েবসাইটে চাওয়া প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের ছবি বা স্ক্যান কপি যুক্ত করতে হবে। সরকারি ফরমে JPG, JPEG ও PNG ফাইল গ্রহণের নির্দেশনা রয়েছে; ফাইলের আকারের সীমাও দেখানো হয়। তাই আপলোডের আগে ওয়েবসাইটে দেওয়া নির্দেশনা দেখে নিন।

৭. আবেদন জমা দেওয়ার আগে সব তথ্য যাচাই করুন

ফরমের সব অংশ পূরণ করার পর নাম, জন্মতারিখ, বাবা-মায়ের পরিচিতি, ঠিকানা এবং সংযুক্ত নথিগুলো আবার পরীক্ষা করুন। সরকারি আবেদনপত্রে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, একবার সাবমিট করার পর আবেদনপত্রে আর সম্পাদনার সুযোগ থাকবে না।

সব তথ্য সঠিক থাকলে আবেদন জমা দিন। আবেদন জমা দেওয়ার পর আবেদন নম্বর সংরক্ষণ করুন এবং সম্ভব হলে আবেদনপত্রটি প্রিন্ট করে রাখুন।

৮. প্রিন্ট কপি ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ে জমা দিন

অনলাইনে আবেদন জমা দেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট নিবন্ধন কার্যালয়ের নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে। প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ আবেদনপত্রের প্রিন্ট কপি নিবন্ধকের কার্যালয়ে জমা দিতে হতে পারে। শুধু অনলাইনে ফরম পূরণ করলেই আবেদন সম্পূর্ণ অনুমোদিত হয়েছে—এমনটি ধরে নেওয়া ঠিক নয়।

আবেদন গ্রহণ, কাগজপত্র যাচাই এবং পরবর্তী কার্যক্রমের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন বা প্রযোজ্য নিবন্ধন কার্যালয় থেকে নিশ্চিত হয়ে নিন।

জন্মনিবন্ধনের অনলাইন আবেদনে কী কী কাগজপত্র লাগতে পারে?

প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আবেদনকারীর বয়স, জন্মতারিখ, পারিবারিক তথ্য এবং পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করতে পারে। তাই সবার জন্য একই তালিকা প্রযোজ্য ধরে নেওয়া ঠিক নয়। আবেদনের সময় সরকারি পোর্টালে যে নথিগুলো চাওয়া হবে, সেগুলোই প্রস্তুত রাখতে হবে।

সাধারণভাবে প্রয়োজন হতে পারে—

জন্মতারিখের প্রমাণ হিসেবে প্রযোজ্য নথি, যেমন টিকা কার্ড বা হাসপাতালের ছাড়পত্র;

বাবা-মায়ের জন্মনিবন্ধন বা জাতীয় পরিচয়পত্রসংক্রান্ত তথ্য;

স্থায়ী ঠিকানার প্রমাণ;

আবেদনকারীর পরিচয় ও সম্পর্কের প্রমাণ, যেখানে প্রযোজ্য;

আইনানুগ অভিভাবক বা ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তি আবেদন করলে সংশ্লিষ্ট প্রমাণপত্র।

এসব নথির সবগুলো প্রত্যেক আবেদনে বাধ্যতামূলক—এমন নয়। আবেদনকারীর তথ্য অনুযায়ী সরকারি পোর্টালে প্রয়োজনীয় নথির নির্দেশনা দেখে নেওয়াই সঠিক পদ্ধতি।

জন্মনিবন্ধনের আবেদন করতে কত টাকা লাগে?

জন্মনিবন্ধনের ফি আবেদনকারীর পরিস্থিতি ও প্রযোজ্য সরকারি বিধান অনুযায়ী নির্ধারিত হয়। তাই অনলাইনে আবেদন করার আগে সংশ্লিষ্ট নিবন্ধন কার্যালয় বা জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন কর্তৃপক্ষের প্রকাশিত ফি-সংক্রান্ত নির্দেশনা যাচাই করা উচিত।

ফি দিতে হলে সরকারি নিয়মে নির্ধারিত পদ্ধতি অনুসরণ করুন। কোনো ব্যক্তি বা অননুমোদিত ওয়েবসাইটের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধ করবেন না। ফি ও পরিশোধ পদ্ধতি সম্পর্কে নিশ্চিত হতে রেজিস্ট্রার জেনারেলের কার্যালয়ের সরকারি ওয়েবসাইট দেখতে পারেন: https://orgbdr.gov.bd/।

অনলাইনে আবেদন করার পর জন্মনিবন্ধনের অবস্থা জানবেন যেভাবে

আবেদন জমা দেওয়ার পর আবেদন নম্বরটি সংরক্ষণ করা জরুরি। আবেদনপত্রের কপি প্রয়োজন হলে সরকারি পোর্টালের আবেদনপত্র প্রিন্ট সেবা ব্যবহার করা যায়।

আবেদনপত্র প্রিন্ট করার জন্য সরকারি লিংক: https://bdris.gov.bd/application/print

এখানে আবেদনপত্রের ধরন, আবেদন নম্বর এবং ফরমে চাওয়া অন্যান্য তথ্য দিয়ে প্রিন্টের চেষ্টা করা যায়। আবেদন অনুমোদন বা সনদ সংগ্রহের বিষয়ে কোনো অস্পষ্টতা থাকলে সংশ্লিষ্ট নিবন্ধন কার্যালয়ে যোগাযোগ করুন।

জন্মনিবন্ধনের আবেদন করার সময় যেসব ভুল এড়িয়ে চলবেন

জন্মনিবন্ধনের আবেদন জমা দেওয়ার আগে কয়েকটি বিষয়ে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।

প্রথমত, নামের বাংলা ও ইংরেজি বানান এবং জন্মতারিখ নির্ভরযোগ্য নথির সঙ্গে মিলিয়ে নিন। দ্বিতীয়ত, বাবা-মায়ের পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য ও ঠিকানা সঠিকভাবে পূরণ করুন। তৃতীয়ত, একই ব্যক্তির নামে আগে জন্মনিবন্ধন হয়ে থাকলে নতুন করে আরেকটি আবেদন করবেন না। একই ব্যক্তির একাধিক জন্মনিবন্ধন আইন অনুযায়ী দণ্ডনীয় অপরাধ।

এ ছাড়া আবেদন জমা দেওয়ার আগে সব তথ্য ভালোভাবে যাচাই করুন এবং আবেদন নম্বর সংরক্ষণ করুন। কোনো তথ্য বুঝতে সমস্যা হলে অনুমান করে পূরণ না করে সংশ্লিষ্ট নিবন্ধন কার্যালয়ের সহায়তা নিন।

জন্মনিবন্ধনের জন্য অনলাইনে আবেদন করা সহজ হলেও সঠিক তথ্য দেওয়া, প্রয়োজনীয় নথি যুক্ত করা এবং আবেদন জমা দেওয়ার পর সংশ্লিষ্ট নিবন্ধন কার্যালয়ের নির্দেশনা অনুসরণ করা জরুরি। সরকারি BDRIS পোর্টাল ব্যবহার করে আবেদন শুরু করুন, জমা দেওয়ার আগে প্রতিটি তথ্য যাচাই করুন এবং আবেদন নম্বরটি সংরক্ষণ করুন। এতে ভুলের ঝুঁকি কমবে এবং পরবর্তী সময়ে আবেদনসংক্রান্ত তথ্য খুঁজে পাওয়া সহজ হবে।

সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)

১. জন্মনিবন্ধনের অনলাইন আবেদন কোথায় করবেন?

বাংলাদেশ সরকারের জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন সিস্টেমের ওয়েবসাইট https://bdris.gov.bd/br/application থেকে নতুন জন্মনিবন্ধনের আবেদন করা যায়।

২. অনলাইনে আবেদন করলেই কি জন্মনিবন্ধন হয়ে যায়?

না। অনলাইনে আবেদন জমা দেওয়ার পর প্রয়োজন অনুযায়ী আবেদনপত্রের প্রিন্ট কপি ও কাগজপত্র সংশ্লিষ্ট নিবন্ধন কার্যালয়ে জমা দিতে এবং যাচাই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হতে পারে।

৩. জন্মনিবন্ধনের জন্য কী কী কাগজপত্র লাগে?

আবেদনকারীর বয়স ও পরিস্থিতি অনুযায়ী জন্মতারিখের প্রমাণ, বাবা-মায়ের পরিচয়সংক্রান্ত নথি, ঠিকানার প্রমাণ এবং অন্যান্য কাগজপত্র লাগতে পারে। সরকারি পোর্টালে প্রদর্শিত নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে।

৪. জন্মনিবন্ধনের আবেদনপত্র কীভাবে প্রিন্ট করব?

https://bdris.gov.bd/application/print লিংকে গিয়ে আবেদনপত্রের ধরন, আবেদন নম্বর ও প্রয়োজনীয় তথ্য দিয়ে প্রিন্টের চেষ্টা করতে পারেন।

৫. জন্মনিবন্ধনের আবেদন জমা দেওয়ার পর কী করতে হবে?

আবেদন নম্বর সংরক্ষণ করুন এবং সংশ্লিষ্ট নিবন্ধন কার্যালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিন। আবেদন বা সনদের অবস্থা জানতে ওই কার্যালয়ে যোগাযোগ করতে পারেন।

তানভির ইসলাম/

পাঠকের মতামত: