বিশ্বের ঋণ ৩৬৫ ট্রিলিয়ন ডলার, বাংলাদেশ কত নম্বরে?
বিশ্বের অর্থনীতিতে ঋণের বোঝা এতটাই বেড়েছে যে, শুধু ঋণ পরিশোধের সুদ মেটাতেই উন্নত দেশগুলোকে বছরে ৩ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি ব্যয় করতে হচ্ছে। সরকার, পরিবার ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে বিশ্বে মোট ঋণের পরিমাণ ৩৬৫ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। এই বিপুল ঋণের মধ্যে সরকারি ঋণের হিসাবে সবচেয়ে এগিয়ে যুক্তরাষ্ট্র। অন্যদিকে বাংলাদেশের অবস্থান ৪৫তম; দেশের মোট ঋণের পরিমাণ ২০৪ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার।
ঋণের পরিমাণ বাড়ার পাশাপাশি তা ব্যবস্থাপনার ব্যয়ও বাড়ছে। এর প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে ইউরোপের বিভিন্ন দেশের অর্থনীতি ও জনজীবনে। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, কম মজুরি, আবাসনসংকট এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাজেট ঘাটতি নিয়ে ফ্রান্স, বেলজিয়াম, ইতালি ও পর্তুগালে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। এসব কর্মসূচির কোনো কোনো স্থানে সংঘর্ষ, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে।
সরকারি অর্থের ওপর ঋণের চাপ কতটা বেড়েছে, তার অন্যতম উদাহরণ ফ্রান্স। ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় বৃদ্ধির কারণে স্কুল, হাসপাতাল ও পেনশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে বরাদ্দ কমে যাওয়ার অভিযোগ তুলছেন বিক্ষোভকারীরা। একই সঙ্গে নতুন ঋণ নেওয়ার খরচ বেড়ে যাওয়ায় সরকারের আর্থিক সংকট সামাল দেওয়ার কাজও কঠিন হয়ে উঠছে।
ঋণের সুদে বিপুল ব্যয়, বাড়ছে সরকারি অর্থের সংকট
ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্সের (আইআইএফ) হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসেই বিশ্বে মোট ঋণ ১০ ট্রিলিয়ন ডলার বেড়েছে। গত জুনের শেষে সরকার, পরিবার ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্মিলিত ঋণ ৩৬৫ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যায়। মাথাপিছু হিসাবে এই ঋণের পরিমাণ প্রায় ৪৪ হাজার ডলার। ঋণ বৃদ্ধির বড় অংশ এসেছে উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলো থেকে।
এই ঋণের বিপরীতে সুদ পরিশোধের অঙ্কও বড় হচ্ছে। গত এক বছরে উন্নত অর্থনীতির দেশগুলো সরকারি বন্ডের সুদ মেটাতে ৩ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি খরচ করেছে।
ব্যয়ের এই পরিমাণ তুলনা করলে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। বিশ্বে সামরিক খাতে ব্যয় হয়েছে ৩ দশমিক ১ ট্রিলিয়ন ডলার। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই খাতে ব্যয়ের পরিমাণ ২ দশমিক ৬ ট্রিলিয়ন ডলার এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানি খাতে ২ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ এসব খাতের প্রতিটিতে ব্যয়ের চেয়েও বেশি অর্থ যাচ্ছে উন্নত অর্থনীতির দেশগুলোর সরকারি বন্ডের সুদ পরিশোধে।
সুদের পেছনে সরকারের ব্যয় বাড়লে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামোর মতো খাতে অর্থায়নের সুযোগ সংকুচিত হতে পারে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারকে কর বাড়ানো কিংবা অন্য খাতের ব্যয় কমানোর পথও বেছে নিতে হতে পারে। এর প্রভাব সরকারি বাজেটের বাইরেও পড়ে; ঋণের খরচ বাড়লে বন্ধকি ঋণ, গাড়ি কেনার ঋণ ও ক্রেডিট কার্ডের সুদের হারও বেড়ে যেতে পারে।
ফ্রান্সে ঋণের খরচ ২০০২ সালের পর সর্বোচ্চ
ইউরোপের ঋণসংকটের চিত্র এখন বিশেষভাবে স্পষ্ট ফ্রান্সে। দেশটির ঋণ নেওয়ার খরচ ২০০২ সালের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। বর্তমানে ইউরোজোনে ১০ বছর মেয়াদি ঋণের জন্য ফ্রান্সকে প্রায় ৫ শতাংশ সুদ দিতে হচ্ছে। একই মেয়াদের ঋণে জার্মানির সুদের হার ৩ দশমিক ৪১ শতাংশ। ইতালি ও গ্রিসের তুলনায়ও এখন ফ্রান্সকে বেশি সুদ দিতে হচ্ছে। ইউরোজোনের বাইরে শুধু যুক্তরাজ্য বর্তমানে ফ্রান্সের চেয়ে বেশি সুদে ঋণ নিচ্ছে।
ঋণের সুদ বৃদ্ধির কারণে সরকারি ব্যয়ের ওপর চাপ তৈরি হওয়ায় ফ্রান্সে অসন্তোষও বাড়ছে। দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, শিক্ষা ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে গত শনিবার দেশজুড়ে ৫ লাখ ৫০ হাজারের বেশি মানুষ বিক্ষোভ করেছেন।
বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, ঋণের সুদ মেটাতে সরকারের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় হওয়ায় স্কুল, হাসপাতাল ও পেনশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাত ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, কম মজুরি, আবাসনসংকট এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাজেট ঘাটতিও তাঁদের প্রতিবাদের কারণ।
ঋণের উচ্চ সুদের এমন পরিস্থিতি ইউরোপে আগেও দেখা গেছে। ২০১০ থেকে ২০১২ সালের ইউরোজোন ঋণসংকটের সময় গ্রিস, ইতালি ও স্পেনের মতো সংকটাপন্ন দেশগুলোকে ৫ শতাংশ বা তার বেশি সুদ দিতে হয়েছিল। সুদের হার ৭ শতাংশ ছাড়িয়ে যাওয়ার পর আয়ারল্যান্ড ও পর্তুগালকে আন্তর্জাতিক সহায়তা নিতে হয়েছিল।
সরকারি ঋণের তালিকায় যুক্তরাষ্ট্র প্রথম, চীন দ্বিতীয়
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) তথ্য অনুযায়ী, সরকারি ঋণের পরিমাণের হিসাবে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের শীর্ষে রয়েছে। দেশটির ঋণ ৪১ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার, যা মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১২৭ শতাংশ।
বিশ্বের প্রধান রিজার্ভ মুদ্রা মার্কিন ডলার হওয়ায় ঋণ সংগ্রহে যুক্তরাষ্ট্র বিশেষ সুবিধা পায়। আন্তর্জাতিক বাজারে ডলারের ব্যাপক চাহিদা থাকায় মার্কিন ঋণপত্রেও বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ থাকে। তবে এই সুবিধা যুক্তরাষ্ট্রকে সীমাহীন ঋণ নেওয়ার সুযোগ দেয় না।
সরকারি ঋণের পরিমাণে দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা চীনের ঋণ ২২ দশমিক ৫০ ট্রিলিয়ন ডলার। দেশটির ঋণ-জিডিপি অনুপাত ১০৪ শতাংশ। এরপর রয়েছে জাপান, যার সরকারি ঋণ ৮ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলার। বড় অর্থনীতির দেশগুলোর মধ্যে জাপানের ঋণ-জিডিপি অনুপাত সবচেয়ে বেশি, ১৯৯ শতাংশ।
তালিকার চতুর্থ স্থানে থাকা যুক্তরাজ্যের সরকারি ঋণ ৪ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার, যা জিডিপির ১০২ শতাংশ। পঞ্চম স্থানে রয়েছে ফ্রান্স। দেশটির সরকারি ঋণের পরিমাণ ৪ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলার এবং ঋণ-জিডিপি অনুপাত ১১৮ শতাংশ।
ইতালির ঋণ ৩ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলার, যা জিডিপির ১৩৮ শতাংশ। জার্মানির সরকারি ঋণ ৩ দশমিক ৫ ট্রিলিয়ন ডলার; দেশটির ঋণ-জিডিপি অনুপাত ৬৫ শতাংশ। অন্যদিকে সরকারি ঋণের পরিমাণের হিসাবে ভারত রয়েছে সপ্তম স্থানে। দেশটির ঋণ ৩ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার, যা জিডিপির ৮৩ শতাংশ।
বাংলাদেশের ঋণ ২০৪.৯ বিলিয়ন ডলার
বৈশ্বিক ঋণের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান ৪৫তম। বর্তমানে দেশের মোট ঋণের পরিমাণ ২০৪ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার, যা জিডিপির ৪০ শতাংশ।
২০১০ সালে বাংলাদেশের ঋণের পরিমাণ ছিল ৪০ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার। সে তুলনায় গত দেড় দশকে ঋণ বেড়েছে প্রায় পাঁচ গুণ। তবে উন্নত বিশ্বের বিভিন্ন দেশের তুলনায় বাংলাদেশের ঋণ-জিডিপি অনুপাত এখনো তুলনামূলক কম।
ঋণের এই চিত্রের পাশাপাশি ইউরোপের দেশগুলোর আর্থিক অবস্থাও উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ফ্রান্সের সরকারি ঋণের ভবিষ্যৎ নিয়ে আইএমএফ সতর্ক পূর্বাভাস দিয়েছে। সংস্থাটির ধারণা, ২০৩০ সাল নাগাদ দেশটির সরকারি ঋণ জিডিপির ১২১ দশমিক ৮ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। এতে সরকারি অর্থব্যবস্থাকে টেকসই অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়ার প্রচেষ্টা আরও কঠিন হয়ে পড়বে।
সরকার বন্ড বিক্রি করে কীভাবে ঋণ নেয়
সরকারি ঋণ সংগ্রহের একটি প্রচলিত পদ্ধতি হলো বন্ড বিক্রি। সাধারণ মানুষের মতো সরকারকেও বিভিন্ন ব্যয় মেটাতে অর্থ ধার করতে হয়, তবে ব্যাংক থেকে সরাসরি ঋণ নেওয়ার পরিবর্তে সরকার বিনিয়োগকারীদের কাছে বন্ড বিক্রি করে অর্থ সংগ্রহ করে।
বন্ড কেনার বিনিময়ে বিনিয়োগকারীরা সুদ পান। পাশাপাশি নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষে তাঁদের মূল অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয় সরকার। উদাহরণ হিসেবে, ১০ বছর মেয়াদি বন্ডের অর্থ ১০ বছর পর পরিশোধ করতে হয়।
এই বন্ডের ইল্ড বা মুনাফার হার দিয়ে বোঝা যায়, সরকারকে ঋণ দেওয়ার বিনিময়ে বিনিয়োগকারীরা কী হারে আয় করছেন। আর্থিক বাজারে সরকারের ঋণ ব্যবস্থাপনার দক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও এই হার গুরুত্বপূর্ণ।
বন্ডের দাম কমলে সাধারণত ইল্ড বেড়ে যায়। তখন সরকারকে নতুন ঋণ নিতে বেশি সুদ দিতে হয়। ফলে পুরোনো ঋণের পাশাপাশি নতুন ঋণ সংগ্রহের খরচও সরকারি বাজেটের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
বিশ্বের মোট ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি, সুদ পরিশোধে বিপুল ব্যয় এবং ইউরোপে চলমান বিক্ষোভ—এই তিনটি বিষয় দেখিয়ে দিচ্ছে, ঋণ শুধু সরকারের হিসাবের খাতায় সীমাবদ্ধ নেই। ঋণ ব্যবস্থাপনার ব্যয় বাড়লে তার প্রভাব সরকারি পরিষেবা থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের ব্যক্তিগত ঋণ নেওয়ার খরচ পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে।
সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)
১. বর্তমানে বিশ্বে মোট ঋণের পরিমাণ কত?
আইআইএফের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুনের শেষে সরকার, পরিবার ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে বৈশ্বিক ঋণের পরিমাণ ৩৬৫ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে।
২. বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সরকারি ঋণ কোন দেশের?
আইএমএফের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ঋণ সবচেয়ে বেশি। দেশটির ঋণের পরিমাণ ৪১ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার, যা জিডিপির ১২৭ শতাংশ।
৩. বৈশ্বিক ঋণের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান কত?
প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের অবস্থান ৪৫তম। দেশের মোট ঋণের পরিমাণ ২০৪ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার, যা জিডিপির ৪০ শতাংশ।
৪. গত দেড় দশকে বাংলাদেশের ঋণ কতটা বেড়েছে?
২০১০ সালে বাংলাদেশের ঋণের পরিমাণ ছিল ৪০ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার। বর্তমানে তা ২০৪ দশমিক ৯ বিলিয়ন ডলার, অর্থাৎ প্রায় পাঁচ গুণ।
৫. সরকারি ঋণের সুদ বাড়লে সাধারণ মানুষের ওপর কী প্রভাব পড়ে?
সরকারের সুদ পরিশোধের ব্যয় বাড়লে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অবকাঠামোর মতো খাতে অর্থ বরাদ্দের ওপর চাপ পড়তে পারে। পাশাপাশি বন্ধকি ঋণ, গাড়ি কেনার ঋণ এবং ক্রেডিট কার্ডের সুদের হারও বেড়ে যেতে পারে।
তানভির ইসলাম/
পাঠকের মতামত:
আপনার জন্য বাছাই করা কিছু নিউজ
- জমি রেজিস্ট্রির সময় কী কী দেখে স্বাক্ষর করবেন? জেনে নিন
- OnePlus Turbo 7 Pro-তে ১৮৫Hz ডিসপ্লে, ১০,০০০mAh ব্যাটারি?
- আজ প্রতি ভরি ১৮, ২১ ও ২২ ক্যারেট সোনার দাম কত
- আজকের টাকার রেট কত:বেড়েছে২টি দেশের টাকার বিনিময় হার
- জমির রেকর্ডে ভুল? সংশোধনের আবেদন করবেন যেখানে
- ড্রাইভিং লাইসেন্স নবায়নে কত টাকা লাগে, দেরি হলে কত জরিমানা
- শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ৩ দিনের ছুটি, তারিখ জেনে নিন
- ওয়ারিশের জমি নামজারি ও আলাদা খতিয়ান করার নিয়ম