ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২৬, ৭ কার্তিক ১৪৩৩

দিনে কতটা মধু খেলে ক্ষতি নেই, জানালেন পুষ্টি বিশেষজ্ঞরা

স্বাস্থ্য ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ অক্টোবর ২২ ১২:০৩:১৫
দিনে কতটা মধু খেলে ক্ষতি নেই, জানালেন পুষ্টি বিশেষজ্ঞরা

চায়ে চিনির বদলে মধু, সর্দি-কাশিতে এক চামচ মধু, কিংবা সকালে কুসুম গরম পানিতে মধু। অনেকের কাছেই মধু মানে নিশ্চিন্তে খাওয়ার মতো প্রাকৃতিক খাবার। কিন্তু পুষ্টিবিদ ও স্বাস্থ্য সংস্থাগুলো বলছে, উপকারের পাশাপাশি একটি সীমারেখাও মানতে হবে। মধু প্রাকৃতিক হলেও শরীরের হিসাবে এটি চিনিরই আরেক রূপ।

মধুতে আসলে কী আছে

মধুর প্রধান উপাদান শর্করা, মূলত গ্লুকোজ ও ফ্রুক্টোজ। এর সঙ্গে থাকে সামান্য পানি, অল্প পরিমাণ খনিজ, এনজাইম এবং ফ্ল্যাভোনয়েড ও ফেনলিক অ্যাসিডের মতো অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট উপাদান। মৌমাছি কোন ফুল থেকে মধু সংগ্রহ করেছে, তার ওপর এসব উপাদানের পরিমাণ নির্ভর করে। সাধারণভাবে গাঢ় রঙের মধুতে অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট তুলনামূলক বেশি থাকে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব হেলথ (এনআইএইচ)।

পুষ্টির হিসাবে এক টেবিল চামচ মধুতে প্রায় ১৭ গ্রাম চিনি ও ৬০ থেকে ৬৪ ক্যালরি থাকে। অর্থাৎ ভিটামিন ও খনিজ থাকলেও পরিমাণ এতই কম যে মধু খেয়ে এসব পুষ্টির চাহিদা মেটানো যায় না।

বিজ্ঞান কী বলছে: কোথায় মধুর সুবিধা আছে

গলাব্যথা ও কাশিতে আরাম: এক বছরের বেশি বয়সী শিশু ও প্রাপ্তবয়স্কদের কাশিতে মধু কিছুটা উপশম দিতে পারে বলে একাধিক গবেষণা পর্যালোচনায় উঠে এসেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) গলা ব্যথা ও কাশি উপশমে মধুকে একটি ঘরোয়া উপায় হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। তবে এটি ওষুধের বিকল্প নয়।

অ্যান্টিঅক্সিড্যান্টের উৎস: মধুর ফ্ল্যাভোনয়েড ও ফেনলিক যৌগ কোষের ক্ষতিকর ক্রিয়া কমাতে সাহায্য করে। এ কারণে হৃদ্স্বাস্থ্যের ওপর মধুর সম্ভাব্য ইতিবাচক প্রভাব নিয়ে গবেষণা হয়েছে। তবে এসব গবেষণার বড় অংশ ছোট পরিসরের, তাই মধু খেলেই হৃদরোগ ঠেকানো যায়, এমন দাবি করার মতো প্রমাণ এখনো নেই।

চিনির তুলনায় সামান্য এগিয়ে: মধুতে অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট ও সামান্য খনিজ থাকায় পরিশোধিত চিনির চেয়ে এটি কিছুটা ভালো বিকল্প হতে পারে। তবে এই সুবিধা খুবই সীমিত।

ক্ষত ও পোড়ায় বাইরে প্রয়োগ: চিকিৎসা-মানের (মেডিক্যাল-গ্রেড) মধু ছোটখাটো ক্ষত ও পোড়ার চিকিৎসায় ব্যবহার হয়। বাজারের সাধারণ মধু একই জিনিস নয়, তাই নিজে থেকে ক্ষতে লাগানো ঠিক নয়।

উপকারের নামে যেসব দাবি ঠিক নয়

মধু খেলে ওজন কমে যায়, রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে থাকে বা নির্দিষ্ট রোগ সেরে যায়, এ ধরনের জোরালো দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। মধু খেলে পরাগজনিত অ্যালার্জি কমে, এ কথাও বৈজ্ঞানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়।

প্রতিদিন কতটা মধু খাওয়া ঠিক

মধুর জন্য আলাদা কোনো সরকারি বা আন্তর্জাতিক দৈনিক মাত্রা নির্ধারিত নেই। তবে ডব্লিউএইচও ও আমেরিকান হার্ট অ্যাসোসিয়েশন (এএইচএ) মধুকে 'অ্যাডেড সুগার' বা যোগ করা চিনির হিসাবেই ধরে।

আরও পড়ুন:

বারবার প্রস্রাব হয় কেন? যেসব লক্ষণ অবহেলা করা বিপজ্জনক

চুল পড়া বন্ধ করতে কী খাবেন? কোন পুষ্টির ঘাটতি দায়ী

ডব্লিউএইচওর পরামর্শ, প্রতিদিনের মোট ক্যালরির ১০ শতাংশের কম আসুক যোগ করা চিনি থেকে। আরও কম, অর্থাৎ ৫ শতাংশের নিচে রাখতে পারলে বাড়তি সুবিধা মেলে। ৫ শতাংশ মানে প্রায় ২৫ গ্রাম বা ছয় চা-চামচ।

এএইচএর সীমা নারীদের জন্য দিনে সর্বোচ্চ ২৫ গ্রাম (প্রায় ৬ চা-চামচ) এবং পুরুষদের জন্য ৩৬ গ্রাম (প্রায় ৯ চা-চামচ)।

এই হিসাবে এক টেবিল চামচ মধুই একজন নারীর দৈনিক সীমার বড় অংশ খরচ করে ফেলে। চা, মিষ্টি, বিস্কুট, কোমল পানীয় বা প্যাকেটজাত জুসে যে চিনি আছে, তা-ও এই সীমার মধ্যেই পড়ে।

তাই ব্যবহারিক পরামর্শ হলো, যাঁরা নিয়মিত মধু খান, তাঁরা দিনে এক থেকে দুই চা-চামচের মধ্যে থাকলে নিরাপদ পাশে থাকবেন। চিনির বদলে মধু ব্যবহার করলে মোট চিনির পরিমাণও কমাতে হবে। চিনিও খাচ্ছেন, আবার মধুও যোগ করছেন, এমনটা হলে লাভ হয় না।

কাদের বাড়তি সতর্ক থাকতে হবে

এক বছরের কম বয়সী শিশু: শিশুদের মধু দেওয়া একেবারেই নিষিদ্ধ। মধুতে ক্লস্ট্রিডিয়াম বোটুলিনাম ব্যাকটেরিয়ার স্পোর থাকতে পারে, যা শিশুদের মধ্যে বটুলিজম নামের মারাত্মক অসুখ ঘটাতে পারে।ডায়াবেটিস আক্রান্ত ব্যক্তি: মধুও রক্তে শর্করা বাড়ায়। কতটুকু খাবেন, তা চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শে ঠিক করা উচিত।

ওজন নিয়ে সচেতন ও হৃদরোগের ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তি: অতিরিক্ত চিনি, মধু থেকে এলেও, ওজন বাড়ায় এবং ঝুঁকি বাড়ায়।

মৌমাছি বা পরাগে অ্যালার্জি আছে এমন ব্যক্তি: তাঁদের কারও কারও ক্ষেত্রে মধু থেকে প্রতিক্রিয়া হতে পারে।

মধু খাওয়ার পর দাঁত ব্রাশ বা কুলকুচি করা ভালো, কারণ এর আঠালো চিনি দাঁতের ক্ষয়ের কারণ হতে পারে।

কেনার সময় যা মাথায় রাখবেন

বাজারে ভেজাল মধুর সমস্যা আছে। বিশ্বস্ত উৎস ও পরিচিত ব্র্যান্ড থেকে কেনা এবং লেবেলে উপাদানের তালিকা দেখে নেওয়া ভালো। ঘরোয়া পরীক্ষা দিয়ে মধুর খাঁটিত্ব নিশ্চিতভাবে বোঝা যায় না, নিশ্চিত হতে হলে ল্যাবরেটরি পরীক্ষাই একমাত্র ভরসা।

মোদ্দা কথা

মধু সুস্বাদু, কিছু ক্ষেত্রে সামান্য উপকারীও। তবে এটি 'সুপারফুড' বা ওষুধ নয়। স্বাস্থ্য সংস্থাগুলোর হিসাবে মধু চিনির মতোই যোগ করা চিনি, তাই মধু খেতে হবে মাপমতো, সামগ্রিক চিনির হিসাবের ভেতরে থেকে।

(বিশেষ দ্রষ্টব্য: এই প্রতিবেদন সাধারণ তথ্যের জন্য। কোনো রোগ বা শারীরিক জটিলতা থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।)

সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)

১. প্রতিদিন কতটা মধু খাওয়া নিরাপদ?

মধুর জন্য নির্দিষ্ট সরকারি মাত্রা নেই। সুস্থ প্রাপ্তবয়স্করা দিনে এক থেকে দুই চা-চামচের মধ্যে থাকলে নিরাপদ। তবে মোট যোগ করা চিনির সীমা মাথায় রাখতে হবে, যা এএইচএর মতে নারীদের জন্য ২৫ গ্রাম ও পুরুষদের জন্য ৩৬ গ্রাম।

২. মধু কি চিনির চেয়ে স্বাস্থ্যকর?

সামান্য এগিয়ে, কারণ মধুতে অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট ও অল্প খনিজ থাকে। তবে স্বাস্থ্য সংস্থাগুলো মধুকেও যোগ করা চিনি হিসেবেই গণ্য করে, তাই বেশি খেলে একই ক্ষতি হতে পারে।

৩. ডায়াবেটিস থাকলে কি মধু খাওয়া যাবে?

মধুও রক্তে শর্করা বাড়ায়। খাওয়ার আগে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

৪. শিশুদের কি মধু দেওয়া যাবে?

এক বছরের কম বয়সী শিশুকে কোনোভাবেই মধু দেওয়া যাবে না, কারণ বটুলিজমের ঝুঁকি আছে। এক বছরের বেশি বয়সী শিশুদের ক্ষেত্রে অল্প পরিমাণ নিরাপদ বলে ধরা হয়।

৫. মধু কি সর্দি-কাশিতে সত্যিই কাজ করে?

এক বছরের বেশি বয়সী শিশু ও প্রাপ্তবয়স্কদের কাশিতে মধু কিছুটা আরাম দিতে পারে। তবে কাশি বা জ্বর কয়েক দিনের বেশি থাকলে চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে।

তানভির ইসলাম/

পাঠকের মতামত:

আপনার জন্য বাছাই করা কিছু নিউজ