ঢাকা, বুধবার, ২৮ অক্টোবর ২০২৬, ১৩ কার্তিক ১৪৩৩

হৃদস্পন্দন হঠাৎ বেড়ে যায় কেন, কখন ডাক্তার দেখাবেন

স্বাস্থ্য ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ অক্টোবর ২৮ ১৩:৩১:৪৩
হৃদস্পন্দন হঠাৎ বেড়ে যায় কেন, কখন ডাক্তার দেখাবেন

বিনা কারণে হঠাৎ মনে হলো বুকের ভেতর হৃৎপিণ্ড দ্রুত লাফাচ্ছে, কাঁপছে কিংবা একটা স্পন্দন বাদ পড়ে গেল। এমন অভিজ্ঞতা অনেকেরই হয়, আর তখন আতঙ্ক ঘিরে ধরাটা স্বাভাবিক। চিকিৎসকেরা বলছেন, এই অনুভূতি দুশ্চিন্তার কারণ হতে পারে, তবে সাধারণত এটি ক্ষতিকর নয়। আবার কিছু ক্ষেত্রে এটি গুরুতর সমস্যার সংকেতও হতে পারে। তাই কখন নিশ্চিন্ত থাকা যায় আর কখন দেরি না করে চিকিৎসকের কাছে যেতে হবে, সেটি জানা দরকার।

আসলে কী ঘটে

চিকিৎসার ভাষায় একে বলা হয় হার্ট প্যালপিটেশন। এতে মনে হতে পারে হৃৎপিণ্ড দ্রুত স্পন্দিত হচ্ছে, কাঁপছে বা জোরে ধাক্কা দিচ্ছে। এই অনুভূতি বুকের পাশাপাশি গলা বা ঘাড়েও টের পাওয়া যেতে পারে।

একজন হৃদ্রোগ বিশেষজ্ঞের ব্যাখ্যা, পরিশ্রমের পর বা ভয় পেলে ("ফাইট অর ফ্লাইট" প্রতিক্রিয়ায়) বুক ধুকপুক করা স্বাভাবিক। ডাক্তারেরা প্যালপিটেশন বলতে বোঝান নিজের হৃদস্পন্দন সম্পর্কে অস্বস্তিকর সচেতনতাকে।

হৃদস্পন্দন হঠাৎ বেড়ে যায় কেন

চিকিৎসা-সূত্রে যেসব কারণের কথা বলা হয়:

দুশ্চিন্তা, ভয় ও মানসিক চাপ: উদ্বেগ, ভয় বা চাপ প্যালপিটেশনের পরিচিত কারণ।

কঠোর ব্যায়াম বা পরিশ্রম: জোরালো ব্যায়ামও এর একটি কারণ।

ক্যাফেইন, অ্যালকোহল ও মাদক: এসব উদ্দীপক পদার্থ প্যালপিটেশন ঘটাতে পারে, যা সাধারণত ক্ষণস্থায়ী ও ক্ষতিকর নয়। কোকেন ও অ্যামফিটামিনের মতো কিছু ওষুধ বা মাদকও হৃদস্পন্দন বাড়ায়।

থাইরয়েডের সমস্যা: অতিসক্রিয় থাইরয়েড (হাইপারথাইরয়েডিজম) এর পেছনে থাকতে পারে।

হৃদ্ছন্দের গোলমাল (অ্যারিদমিয়া): হৃৎপিণ্ডের ভেতরের বৈদ্যুতিক কার্যকলাপে অস্বাভাবিকতা থেকে ছন্দের সমস্যা হয়, যাকে বলে অ্যারিদমিয়া।

একটি বিষয় অনেকের কাছে অপ্রত্যাশিত। প্রায়ই প্যালপিটেশনের কারণ খুঁজে পাওয়া যায় না।

কতটা চিন্তার কারণ

স্বস্তির খবর হলো, যাঁদের প্যালপিটেশন হয়, তাঁদের অর্ধেকেরও কম মানুষের অ্যারিদমিয়া দেখা দেয়। বেশির ভাগ প্যালপিটেশন বিরক্তিকর, তবে চিকিৎসাগতভাবে ক্ষতিকর নয়। তবে নির্দিষ্ট কিছু অ্যারিদমিয়া থেকে হওয়া প্যালপিটেশনের একটি অংশ ক্ষতিকর হতে পারে।

প্যালপিটেশন কম হলে বা মাত্র কয়েক সেকেন্ড স্থায়ী হলে সাধারণত চিকিৎসা-মূল্যায়নের প্রয়োজন পড়ে না।

কখন ডাক্তার দেখাবেন

যত দ্রুত সম্ভব চিকিৎসকের সঙ্গে সময় নিন, যদি:

প্যালপিটেশন আপনাকে উদ্বিগ্ন করে

প্যালপিটেশন ক্রমশ বাড়ছে

হৃদ্রোগের ইতিহাস আছে এবং প্রায়ই প্যালপিটেশন হচ্ছে

কখন জরুরি বিভাগে যাবেন

প্যালপিটেশনের সঙ্গে বুকে ব্যথা, তীব্র শ্বাসকষ্ট, তীব্র মাথা ঘোরা, অতিরিক্ত ঘাম বা অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিলে জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে।

যেসব ক্ষেত্রে চিকিৎসকেরা বেশি সতর্ক হন: আগে থেকে হৃদ্রোগ বা পরিবারে হৃদ্রোগ ও আকস্মিক মৃত্যুর ইতিহাস থাকলে, এবং প্যালপিটেশনের সময় অজ্ঞান হওয়া বা মাথা হালকা লাগার মতো লক্ষণ থাকলে।

গুরুতর সমস্যার ঝুঁকি কোথায়

প্যালপিটেশনের পেছনে হৃদ্রোগ থাকলে জটিলতা দেখা দিতে পারে:

অজ্ঞান হয়ে যাওয়া: হৃদস্পন্দন খুব দ্রুত হলে রক্তচাপ কমে গিয়ে এমন হতে পারে।হার্ট ফেইলিউর।

বিরল ক্ষেত্রে প্রাণঘাতী হৃদ্ছন্দের সমস্যায় হৃৎপিণ্ড কার্যকরভাবে স্পন্দন বন্ধ করে দিতে পারে।

হৃদ্রোগ না থাকলে জটিলতার ঝুঁকি খুব কম।

ডাক্তার কীভাবে কারণ খোঁজেন

চিকিৎসক জানতে চান প্যালপিটেশন কখন হয়, কতক্ষণ থাকে এবং কিছু কি এটি ঘটায় বা কমায়। এরপর প্রয়োজন অনুযায়ী পরীক্ষা দেওয়া হয়:

হল্টার মনিটর বা ইলেকট্রোকার্ডিওগ্রাম (ইসিজি)

রক্তপরীক্ষা, যা প্যালপিটেশন ঘটাতে বা বাড়াতে পারে এমন চিকিৎসা-অবস্থা শনাক্ত করে

হৃৎপিণ্ডের গঠনগত সমস্যা শনাক্তে সহায়ক ইমেজিং পরীক্ষা

হৃদ্রোগজনিত না হলে প্যালপিটেশনে সাধারণত চিকিৎসার দরকার পড়ে না। কারণ হিসেবে হৃদ্ছন্দের রোগ বা অন্য কোনো চিকিৎসা-অবস্থা থাকলে চিকিৎসক হৃদস্পন্দনের হার বা ছন্দ নিয়ন্ত্রণের ওষুধ দিতে পারেন।

নিজে কী করতে পারেন

হঠাৎ জোরালো ব্যায়াম, মানসিক চাপ ও উদ্দীপক পদার্থ কমালে উপসর্গ কিছুটা ভালো হতে পারে। জীবনযাপনে পরিবর্তন প্রায়ই প্যালপিটেশন সামলাতে বড় ভূমিকা রাখে। তবে তাতে কাজ না হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।

চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার আগে লিখে রাখা সহায়ক: কখন শুরু হয়েছিল, কতক্ষণ ছিল, তখন কী করছিলেন, আর অন্য কোনো উপসর্গ ছিল কি না।

এই প্রতিবেদন সাধারণ তথ্যের জন্য, চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়।

প্রাসঙ্গিক FAQ

১. বুক ধড়ফড় করলেই কি হার্টের রোগ?

না। যাঁদের প্যালপিটেশন হয়, তাঁদের অর্ধেকেরও কম মানুষের অ্যারিদমিয়া হয়। তবে বিরল ক্ষেত্রে এটি গুরুতর সমস্যার ইঙ্গিত হতে পারে।

২. কোন কোন জিনিস হৃদস্পন্দন বাড়ায়?

উদ্বেগ, ভয় বা মানসিক চাপ, কঠোর ব্যায়াম, ক্যাফেইন, অ্যালকোহল, মাদক ও অতিসক্রিয় থাইরয়েড। কখনো কারণ খুঁজেই পাওয়া যায় না।

৩. কখন সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালে যেতে হবে?

প্যালপিটেশনের সঙ্গে বুকে ব্যথা, তীব্র শ্বাসকষ্ট, তীব্র মাথা ঘোরা, অতিরিক্ত ঘাম বা অজ্ঞান হওয়ার মতো লক্ষণ থাকলে।

৪. ডাক্তার কী পরীক্ষা করতে পারেন?

ইসিজি, হল্টার মনিটর, রক্তপরীক্ষা এবং প্রয়োজনে হৃৎপিণ্ডের গঠন দেখার ইমেজিং পরীক্ষা।

৫. ঘরে কী করলে উপকার হতে পারে?

মানসিক চাপ, হঠাৎ কঠোর ব্যায়াম ও ক্যাফেইনের মতো উদ্দীপক পদার্থ কমানো।

তানভির ইসলাম/

পাঠকের মতামত: