ঢাকা, শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৩ আশ্বিন ১৪৩৩

ইন্দোনেশিয়ার প্রথম রণতরি ‘কেআরআই শ্রীবিজয়া’

বিশ্ব ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ সেপ্টেম্বর ১৮ ১৭:৫৫:০০
ইন্দোনেশিয়ার প্রথম রণতরি ‘কেআরআই শ্রীবিজয়া’

একসঙ্গে সর্বোচ্চ ১৮টি হেলিকপ্টার বহনের সক্ষমতা নিয়ে ইন্দোনেশিয়ার নৌবাহিনীতে প্রথমবারের মতো যুক্ত হয়েছে একটি রণতরি। ১৮০ মিটার দীর্ঘ এই জাহাজে ৮৩০ জন সদস্য থাকার সুযোগ রয়েছে। তবে যুদ্ধের কাজে নয়, দুর্যোগের সময় ত্রাণ ও উদ্ধার তৎপরতায় জাহাজটির সক্ষমতা কাজে লাগানোর ওপর জোর দিচ্ছে জাকার্তা।

শুক্রবার এ তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি।

ইতালীয় নৌবাহিনী থেকে কেনা এই রণতরিটির বর্তমান নাম ‘জুসেপ্পে গারিবালদি’। ইতালি থেকে যাত্রা করে কলম্বো ও মালাক্কা প্রণালি পেরিয়ে এটি জাকার্তার একটি বন্দরে পৌঁছেছে। আগামী সপ্তাহে জাহাজটির নতুন নাম দেওয়া হবে ‘কেআরআই শ্রীবিজয়া’।

দুর্গম এলাকায় দ্রুত ত্রাণ পৌঁছানোর পরিকল্পনা

ইন্দোনেশিয়ার নৌবাহিনীর চিফ অব স্টাফ মুহাম্মদ আলীর বক্তব্য অনুযায়ী, দেশটিতে প্রায়ই বিভিন্ন ধরনের দুর্যোগ ঘটে। এমন পরিস্থিতিতে প্রত্যন্ত অঞ্চলে দ্রুত সহায়তা পাঠানোর জন্য বড় আকারের হেলিকপ্টারবাহী একটি প্ল্যাটফর্ম প্রয়োজন।

হেলিকপ্টারের মাধ্যমে দুর্গম এলাকায় দ্রুত ত্রাণসামগ্রী পৌঁছানো সম্ভব হওয়ায় রণতরিটির এই সক্ষমতাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এ কারণে জাহাজটি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, ত্রাণ বিতরণ এবং উদ্ধার অভিযানের মতো অসামরিক কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করার পরিকল্পনা রয়েছে।

মুহাম্মদ আলী জানিয়েছেন, রণতরিটি এখনো ভালো অবস্থায় রয়েছে। ইন্দোনেশিয়ার নৌবাহিনী আশা করছে, আগামী ১৫ থেকে ২০ বছর এটি কাজে লাগানো যাবে।

চার দশকের পুরোনো জাহাজ ঘিরে প্রশ্ন

ইন্দোনেশিয়ার হাতে আসা রণতরিটি অবশ্য নতুন নয়। ৪১ বছর আগে নির্মিত এই জাহাজটি ১৯৮৫ সালে ইতালীয় নৌবাহিনীর বহরে যুক্ত হয়েছিল।

এত পুরোনো সামরিক সরঞ্জাম কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েই প্রশ্ন তুলেছেন কয়েকজন বিশ্লেষক। তাদের আশঙ্কা, জাহাজটি সচল রাখতে ভবিষ্যতে বড় অঙ্কের অর্থ রক্ষণাবেক্ষণে ব্যয় হতে পারে। তাদের বক্তব্য, রণতরির পেছনে অর্থ ব্যয়ের পরিবর্তে ইন্দোনেশিয়ার আরও জরুরি কিছু বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। বিদেশি ঋণের বিষয়টিও তারা উদাহরণ হিসেবে সামনে এনেছেন।

সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের গবেষক মুহাম্মদ ফওজান মালুফতির দৃষ্টিতেও জাহাজটির সামরিক কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

তার বক্তব্য, কোনো সংঘাতে এই রণতরি কার্যকরভাবে কাজে লাগানো সম্ভব নাও হতে পারে। অন্যদিকে, যদি জাহাজটির প্রধান দায়িত্ব দুর্যোগ মোকাবিলা হয়, তাহলে এতে অস্ত্রশস্ত্রের পরিমাণ কম থাকার সম্ভাবনা থাকবে। এর ফলে যুদ্ধ পরিচালনার সক্ষমতাও আরও সীমিত হতে পারে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

কেনার আগে ‘পুঙ্খানুপুঙ্খ মূল্যায়ন’

বিশ্লেষকদের আপত্তির জবাবে ইন্দোনেশিয়ার নৌবাহিনী জানিয়েছে, রণতরিটি কেনার সিদ্ধান্ত হঠাৎ নেওয়া হয়নি।

নৌবাহিনীর মুখপাত্র তুঙ্গুল এএফপিকে জানিয়েছেন, কেনার আগে ইন্দোনেশিয়া সরকার ‘পুঙ্খানুপুঙ্খ মূল্যায়ন’ করেছে।

এই ক্রয়কে দেশটির পুরোনো সামরিক সরঞ্জাম আধুনিক করার বৃহত্তর উদ্যোগের অংশ হিসেবেও দেখা হচ্ছে। ২০২৪ সালে নির্বাচিত সাবেক জেনারেল ও প্রেসিডেন্ট প্রাবোয়ো সুবিয়ান্তো সামরিক সরঞ্জাম আধুনিকায়নের পাশাপাশি অন্যান্য দেশের সঙ্গে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছেন।

রাফাল ও সাবমেরিন কেনার উদ্যোগ

প্রাবোয়ো যখন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ছিলেন, তখন ২০২২ সালে জাকার্তা ৮১০ কোটি ডলারের একটি চুক্তি সই করে। এর আওতায় ফ্রান্সের তৈরি ৪২টি রাফাল যুদ্ধবিমান কেনার কথা রয়েছে। মে মাস পর্যন্ত ছয়টি যুদ্ধবিমান ইন্দোনেশিয়াকে সরবরাহ করা হয়েছে।

সামরিক সক্ষমতা বাড়ানোর এই ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালে ফ্রান্সের প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান নাভাল গ্রুপের কাছ থেকেও দুটি স্করপেন শ্রেণির সাবমেরিনের অর্ডার দেয় ইন্দোনেশিয়া। নাভাল গ্রুপ জানিয়েছে, গত আগস্টে সাবমেরিন দুটির নির্মাণ শুরু হয়েছে।

ভারত ও অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গেও প্রতিরক্ষা সম্পর্ক

ইন্দোনেশিয়ার প্রতিরক্ষা সহযোগিতা শুধু ইউরোপীয় দেশগুলোর মধ্যেই সীমিত নেই। জুলাই মাসে জাকার্তা সফর করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সেই সময় ভারত নিশ্চিত করে, ইন্দোনেশিয়াকে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র সরবরাহ করা হবে।

এর আগে ফেব্রুয়ারিতে অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে নিরাপত্তা চুক্তি করেছে ইন্দোনেশিয়া। চুক্তিটির মাধ্যমে দুই দেশের সামরিক সম্পর্ক আরও ঘনিষ্ঠ করার সুযোগ তৈরি হয়েছে। যৌথ সামরিক মহড়ার জন্য প্রশিক্ষণকেন্দ্র উন্নয়নে ক্যানবেরার সহায়তার বিষয়টিও এতে রয়েছে।

এই ধারাবাহিকতার মধ্যেই এবার ইন্দোনেশিয়ার নৌবাহিনীতে প্রথম রণতরি যুক্ত হলো। ইতালীয় নৌবাহিনীতে ব্যবহৃত ‘জুসেপ্পে গারিবালদি’ এখন ইন্দোনেশিয়ার পতাকার অধীনে নতুন নামে দায়িত্ব পালন করবে।

আল-মামুন/

পাঠকের মতামত:

আপনার জন্য বাছাই করা কিছু নিউজ