ঢাকা, রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৫ আশ্বিন ১৪৩৩

সরকারি কোম্পানিতে বড় ধাক্কা, লোকসানে ১২টি

শেয়ারনিউজ ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ সেপ্টেম্বর ২০ ১৩:২০:০২
সরকারি কোম্পানিতে বড় ধাক্কা, লোকসানে ১২টি

শেয়ারবাজারে সরকারি কোম্পানির বিনিয়োগচিত্রে দেখা যাচ্ছে স্পষ্ট বৈপরীত্য। একই তালিকায় থাকা কিছু প্রতিষ্ঠান বড় অঙ্কের মুনাফা করে শেয়ারহোল্ডারদের উল্লেখযোগ্য ডিভিডেন্ড দিচ্ছে, আবার বেশ কয়েকটি কোম্পানি বছরের পর বছর লোকসানের বোঝা টানছে। সর্বশেষ পূর্ণাঙ্গ অর্থবছরের হিসাবে ডিএসইতে তালিকাভুক্ত ২০টি সরকারি কোম্পানির মধ্যে ১২টিই লোকসানে রয়েছে। অর্থাৎ লোকসানের তালিকায় থাকা প্রতিষ্ঠানের হার ৬০ শতাংশ।

এই ১২ কোম্পানির কোনোটিই সর্বশেষ অর্থবছরে বিনিয়োগকারীদের ডিভিডেন্ড দিতে পারেনি। ফলে সরকারি কোম্পানিকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করার মাধ্যমে বিনিয়োগের সুযোগ বাড়ানোর যে প্রত্যাশা রয়েছে, তার সঙ্গে এসব প্রতিষ্ঠানের বর্তমান আর্থিক পারফরম্যান্সে বড় ব্যবধান দেখা যাচ্ছে।

একই তালিকায় মুনাফার বড় ব্যবধান

ডিএসইতে বর্তমানে মোট তালিকাভুক্ত কোম্পানি ৩৬০টি। এর মধ্যে সরকারি কোম্পানি ২০টি। এসব প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ফলাফলে একদিকে যেমন দুর্বলতার চিত্র রয়েছে, অন্যদিকে কয়েকটি কোম্পানি ধারাবাহিক মুনাফা ও ডিভিডেন্ড দিয়ে ব্যতিক্রমী অবস্থান ধরে রেখেছে।

সর্বশেষ অর্থবছরে মেঘনা পেট্রোলিয়ামের শেয়ারপ্রতি মুনাফা (ইপিএস) হয়েছে ৬১ টাকা ৩৯ পয়সা। এর বিপরীতে কোম্পানিটি শেয়ারহোল্ডারদের জন্য ২০০ শতাংশ ডিভিডেন্ড ঘোষণা করেছে। ১৬ সেপ্টেম্বর কোম্পানিটির শেয়ারদর ছিল ২০৬ টাকা ৩০ পয়সা।

যমুনা অয়েলের ইপিএস ছিল ৫৮ টাকা ৭০ পয়সা। কোম্পানিটির ঘোষিত ডিভিডেন্ড ১৮০ শতাংশ। ১৬ সেপ্টেম্বর এর শেয়ারদর ছিল ১৭৬ টাকা ৩০ পয়সা।

আর পদ্মা অয়েলের সর্বশেষ অর্থবছরের ইপিএস হয়েছে ৫৭ টাকা ৩০ পয়সা। কোম্পানিটি ১৬০ শতাংশ ডিভিডেন্ড ঘোষণা করেছে। ১৬ সেপ্টেম্বর পদ্মা অয়েলের শেয়ারদর ছিল ১৯৩ টাকা ৮০ পয়সা।

এ তালিকায় আরও রয়েছে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন, বাংলাদেশ সাবমেরিন কেবল ও ন্যাশনাল টিউবস। বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের ইপিএস ২০ টাকা ১০ পয়সা এবং ডিভিডেন্ড ২৫ শতাংশ। বাংলাদেশ সাবমেরিন কেবলের ইপিএস ১১ টাকা ১ পয়সা, ডিভিডেন্ড ৪০ শতাংশ। ন্যাশনাল টিউবস দিয়েছে ১ শতাংশ ডিভিডেন্ড।

লোকসানের ভার সবচেয়ে বেশি যাদের

অন্য চিত্রটি পাওয়া যায় লোকসানি সরকারি কোম্পানিগুলোর আর্থিক হিসাবে। সর্বশেষ অর্থবছরে ন্যাশনাল টি-এর শেয়ারপ্রতি লোকসান হয়েছে ১০৭ টাকা ৪৯ পয়সা। জিলবাংলা সুগার মিলসের লোকসান ৭৮ টাকা ৮৭ পয়সা এবং শ্যামপুর সুগার মিলসের ৫০ টাকা ৭৭ পয়সা।

এ ছাড়া আইসিবির শেয়ারপ্রতি লোকসান ১৪ টাকা। বিডি সার্ভিসেসের ৮ টাকা ৯৪ পয়সা, তিতাস গ্যাসের ৭ টাকা ৮০ পয়সা এবং রেনউইক যজ্ঞেশ্বরের ৭ টাকা ৭৬ পয়সা লোকসান হয়েছে।

উসমানিয়া গ্লাসের লোকসান দাঁড়িয়েছে ৫ টাকা ৩৪ পয়সা। ইস্টার্ন কেবলসের ৪ টাকা ৪৩ পয়সা, ডেসকোর ৩ টাকা ১৫ পয়সা এবং পাওয়ার গ্রিডের ২ টাকা ৩০ পয়সা শেয়ারপ্রতি লোকসান হয়েছে।

এই প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে জিলবাংলা সুগার মিলস, শ্যামপুর সুগার মিলস, উসমানিয়া গ্লাস, রেনউইক যজ্ঞেশ্বর, বিডি সার্ভিসেস ও ন্যাশনাল টি-এর আর্থিক অবস্থাকে বিশেষভাবে দুর্বল হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। এসব কোম্পানির ব্যবসা ভবিষ্যতে টিকিয়ে রাখা নিয়েও নিরীক্ষকদের পক্ষ থেকে সংশয় প্রকাশ করা হয়েছে।

নিরীক্ষকদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারি আর্থিক সহায়তা না পেলে ভবিষ্যতে এসব প্রতিষ্ঠানের ব্যবসা চালিয়ে যাওয়া কঠিন হতে পারে।

তালিকাভুক্তির আগে যাচাইয়ের ওপর জোর

সরকারি কোম্পানিগুলোর এমন আর্থিক অবস্থার পেছনে ব্যবস্থাপনা ও কাঠামোগত সমস্যাকে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হিসেবে দেখছেন ডিএসই পরিচালক মিনহাজ মান্নান ইমন।

তার মতে, দুর্বল ব্যবস্থাপনা, অদক্ষতা এবং দীর্ঘদিনের কাঠামোগত সমস্যার কারণে সরকারি অনেক প্রতিষ্ঠান লোকসান থেকে বের হতে পারছে না। প্রয়োজনীয় সংস্কার না করেই এসব প্রতিষ্ঠানের একটি অংশকে বছরের পর বছর সরকারি সহায়তার ওপর নির্ভরশীল রাখা হয়েছে বলেও তিনি মনে করেন। এর ফলে সাধারণ বিনিয়োগকারীরা প্রত্যাশিত রিটার্ন থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

মিনহাজ মান্নান ইমনের বক্তব্য অনুযায়ী, সরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানকে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত করার সিদ্ধান্তের আগে তার আর্থিক সক্ষমতা, ব্যবস্থাপনার দক্ষতা এবং ভবিষ্যৎ ব্যবসায়িক সম্ভাবনা যাচাই করা দরকার।

তার মতে, কেবল তালিকাভুক্ত সরকারি প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বাড়ানোর বদলে লাভজনক ও দক্ষভাবে পরিচালিত কোম্পানি নির্বাচন করে বাজারে আনা প্রয়োজন। একই সঙ্গে দুর্বল প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রয়োজনীয় সংস্কার করা হলে শেয়ারবাজারে ভালো কোম্পানির সংখ্যা বাড়ার পাশাপাশি বিনিয়োগঝুঁকিও কমতে পারে।

সরকারি কোম্পানি শেয়ারবাজারে আনার মূল উদ্দেশ্যগুলোর একটি হলো ভালো ব্যবসা করা প্রতিষ্ঠানকে তালিকাভুক্ত করে মানসম্মত কোম্পানির সংখ্যা বাড়ানো। সর্বশেষ আর্থিক হিসাব সেই লক্ষ্য বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে একদিকে ১২টি লোকসানি প্রতিষ্ঠানের দুর্বলতা দেখাচ্ছে, আবার অন্যদিকে কয়েকটি সরকারি কোম্পানির মুনাফা ও ডিভিডেন্ড দেওয়ার সক্ষমতাও তুলে ধরছে।

তানভির ইসলাম/

পাঠকের মতামত:

আপনার জন্য বাছাই করা কিছু নিউজ