ঢাকা, শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১১ আশ্বিন ১৪৩৩

রাতে ঘুম আসতে দেরি হয়? ঘুমের আগে এই অভ্যাসগুলো এড়িয়ে চলুন

লাইফ স্টাইল ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ সেপ্টেম্বর ২৬ ১৯:৫৪:৩২
রাতে ঘুম আসতে দেরি হয়? ঘুমের আগে এই অভ্যাসগুলো এড়িয়ে চলুন

সারাদিনের ব্যস্ততা শেষে বিছানায় যাওয়ার পরও যদি দীর্ঘ সময় ঘুম না আসে, তাহলে সমস্যার কারণ সবসময় শরীর বা মনের কোনো জটিলতা নাও হতে পারে। প্রতিদিনের কিছু অভ্যাস, বিশেষ করে ঘুমানোর আগের কয়েক ঘণ্টার আচরণ, শরীরের স্বাভাবিক ঘুম-জাগরণ চক্রকে ব্যাহত করতে পারে। রাতে দীর্ঘ সময় মোবাইল বা কম্পিউটারের পর্দায় থাকা, বিকেল বা সন্ধ্যার পর ক্যাফেইন গ্রহণ, ভারী খাবার খাওয়া, অনিয়মিত সময়ে ঘুমাতে যাওয়া এবং ঘুমের আগে অতিরিক্ত ব্যায়াম—এসব কারণে ঘুম আসতে দেরি হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভালো ঘুমের জন্য শুধু বিছানায় যাওয়ার সময়টিই গুরুত্বপূর্ণ নয়; বরং ঘুমের আগের সময়টাকে কীভাবে কাটানো হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। নিয়মিত ঘুমের সময় ঠিক রাখা এবং ঘুমের পরিবেশ আরামদায়ক করার পাশাপাশি কয়েকটি অভ্যাস এড়িয়ে চললে অনেকের ঘুমের মান উন্নত হতে পারে।

ঘুমের আগে মোবাইল ও কম্পিউটার ব্যবহার

রাতে বিছানায় যাওয়ার পর মোবাইল স্ক্রল করা, ভিডিও দেখা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার কিংবা কম্পিউটারে কাজ করার অভ্যাস ঘুমের জন্য সহায়ক নয়। ইলেকট্রনিক ডিভাইসের আলো ও মানসিকভাবে উদ্দীপক কনটেন্ট শরীরকে ঘুমের প্রস্তুতি থেকে দূরে রাখতে পারে।

CDC ঘুমের অন্তত ৩০ মিনিট আগে ইলেকট্রনিক ডিভাইস বন্ধ করার পরামর্শ দেয়। NHLBI-ও ঘুমের আগের সময়টায় উজ্জ্বল কৃত্রিম আলো ও স্ক্রিন এড়িয়ে শান্ত পরিবেশে থাকার কথা বলেছে।

তাই ঘুমানোর ঠিক আগে ফোন হাতে নেওয়ার বদলে বই পড়া, হালকা সংগীত শোনা বা শান্ত কোনো রুটিন তৈরি করা যেতে পারে।

বিকেল-সন্ধ্যার পর অতিরিক্ত চা-কফি

অনেকেই মনে করেন, শুধু রাতে কফি খেলেই ঘুমের সমস্যা হবে। বাস্তবে ক্যাফেইনের প্রভাব কয়েক ঘণ্টা থাকতে পারে। ফলে বিকেলের শেষভাগে বা সন্ধ্যায় কফি, চা, ক্যাফেইনযুক্ত কোমল পানীয় কিংবা অন্য ক্যাফেইনযুক্ত খাবার গ্রহণ করলেও রাতে ঘুম আসতে সমস্যা হতে পারে—বিশেষ করে যাদের ক্যাফেইনের প্রতি সংবেদনশীলতা বেশি।

NHLBI জানিয়েছে, ক্যাফেইনের প্রভাব শরীরে দীর্ঘ সময় থাকতে পারে এবং কিছু মানুষের ক্ষেত্রে এটি ঘুমে বাধা তৈরি করে। তাই ঘুমের সমস্যা থাকলে দিনের শেষভাগে ক্যাফেইন কমানো বা এড়িয়ে চলা উপকারী হতে পারে।

ঘুমানোর আগে ভারী খাবার

বিছানায় যাওয়ার অল্প সময় আগে বেশি পরিমাণ খাবার খেলে শরীরে অস্বস্তি তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে ভারী বা ঝাল খাবার হজমের সমস্যা তৈরি করলে ঘুম আরও কঠিন হয়ে যেতে পারে।

CDC ও NHLBI—দুই সংস্থাই ঘুমের কয়েক ঘণ্টা আগে ভারী বা বড় খাবার এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেয়। ক্ষুধা লাগলে অল্প পরিমাণ হালকা খাবার নেওয়া যেতে পারে।

ঘুমের আগে অ্যালকোহল বা ধূমপান

অ্যালকোহল খেলে কারও কারও দ্রুত ঘুম চলে আসতে পারে। কিন্তু এতে ঘুমের মান ভালো হবে—এমন নয়। NHLBI বলছে, অ্যালকোহল ঘুমকে স্বাভাবিকের তুলনায় হালকা করে দিতে পারে এবং রাতে ঘুম ভেঙে যাওয়ার সম্ভাবনা বাড়াতে পারে। নিকোটিনও উদ্দীপক হিসেবে ঘুমে সমস্যা করতে পারে।

তাই ঘুমের সমস্যা থাকলে রাতে অ্যালকোহল ও নিকোটিন এড়িয়ে চলাই ভালো।

ঘুমানোর ঠিক আগে কঠিন ব্যায়াম

নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম ভালো ঘুমের জন্য উপকারী। কিন্তু ঘুমানোর একেবারে কাছাকাছি সময়ে তীব্র ব্যায়াম করলে কিছু মানুষের ক্ষেত্রে ঘুম আসতে দেরি হতে পারে।

NHLBI দিনের বেলায় নিয়মিত শারীরিক কার্যক্রম করার পরামর্শ দেয় এবং ঘুমের খুব কাছাকাছি সময়ে ব্যায়াম না করতে বলে। যাদের রাতে ঘুম আসতে সমস্যা হয়, তারা ব্যায়ামের সময়টা দিনের আগের দিকে রাখার চেষ্টা করতে পারেন।

প্রতিদিন ভিন্ন সময়ে ঘুমাতে যাওয়া

কোনো দিন রাত ১০টায়, আবার কোনো দিন রাত ১টায় ঘুমাতে যাওয়ার অভ্যাস শরীরের ঘুম-জাগরণের স্বাভাবিক ছন্দকে বিঘ্নিত করতে পারে। একইভাবে ছুটির দিনে অনেক দেরি করে ঘুমানো এবং সকালে দেরি করে ওঠাও ঘুমের সময়সূচি এলোমেলো করতে পারে।

CDC ও NHLBI প্রতিদিন প্রায় একই সময়ে ঘুমাতে যাওয়া এবং একই সময়ে ঘুম থেকে ওঠার পরামর্শ দেয়। নিয়মিত সময়সূচি শরীরের ঘুম-জাগরণ চক্রকে স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করে।

দিনের দীর্ঘ সময় ঘুমানো

দুপুরে দীর্ঘ সময় ঘুমালে রাতে স্বাভাবিক সময়ে ঘুম আসতে দেরি হতে পারে। বিশেষ করে যাদের আগে থেকেই রাতে ঘুমের সমস্যা রয়েছে, তাদের দিনের ঘুমের সময় ও সময়সূচির দিকে নজর দেওয়া প্রয়োজন।

Mayo Clinic বলছে, রাতে ঘুমাতে সমস্যা হলে দিনের ঘুম সীমিত করা যেতে পারে; প্রয়োজন হলে ছোট সময়ের জন্য এবং দিনের আগের দিকে ঘুমানো ভালো।

ঘুমের আগে কাজ, পড়াশোনা বা অতিরিক্ত চিন্তা

বিছানায় যাওয়ার ঠিক আগে অফিসের কাজ, পড়াশোনা, গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া কিংবা উত্তেজনাপূর্ণ কোনো বিষয় নিয়ে দীর্ঘ সময় চিন্তা করলেও মস্তিষ্ক শান্ত হতে সময় নিতে পারে। NHLBI বলছে, স্ট্রেস ও অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা অনিদ্রার ঝুঁকি বাড়াতে পারে। এমনকি ঘুম হবে কি না—এ নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তাও সমস্যাকে আরও বাড়াতে পারে।

তাই ঘুমের আগে অন্তত কিছুটা সময় কাজ থেকে দূরে থেকে শরীর ও মনকে ধীরে ধীরে বিশ্রামের জন্য প্রস্তুত করা ভালো।

ঘুম না এলে জোর করে বিছানায় পড়ে থাকবেন না

বিছানায় গিয়ে অনেকক্ষণ ঘুম না এলে বারবার ঘড়ির দিকে তাকানো বা ঘুমানোর জন্য নিজেকে চাপ দেওয়া উল্টো মানসিক চাপ বাড়াতে পারে। Mayo Clinic-এর পরামর্শ অনুযায়ী, ঘুম না এলে কিছু সময়ের জন্য বিছানা থেকে উঠে শান্ত কোনো কাজ করা যেতে পারে। ঘুমঘুম ভাব ফিরে এলে আবার বিছানায় যাওয়া ভালো।

ঘুমের পরিবেশও গুরুত্বপূর্ণ

শুধু অভ্যাস নয়, ঘরের পরিবেশও ঘুমের ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে। খুব বেশি আলো, শব্দ বা অস্বস্তিকর তাপমাত্রা ঘুমে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে।

CDC ও NHLBI ঘুমের জন্য ঘরকে শান্ত, অন্ধকার ও আরামদায়ক তাপমাত্রায় রাখার পরামর্শ দেয়।

ঘুমের আগে কী করতে পারেন?

ঘুমানোর আগের শেষ সময়টাকে শান্ত রাখার চেষ্টা করা যেতে পারে। যেমন—

প্রতিদিন কাছাকাছি সময়ে ঘুমাতে যাওয়া ও ওঠা

ঘুমের আগে মোবাইল ও অন্যান্য স্ক্রিন থেকে বিরতি নেওয়া

সন্ধ্যার পর ক্যাফেইন কমানো

ঘুমের কয়েক ঘণ্টা আগে ভারী খাবার এড়িয়ে চলা

ঘুমের আগে তীব্র ব্যায়াম না করা

ঘর শান্ত, অন্ধকার ও আরামদায়ক রাখা

বই পড়া, হালকা সংগীত শোনা বা উষ্ণ গোসলের মতো শান্ত রুটিন তৈরি করা

দিনের বেলায় নিয়মিত শারীরিকভাবে সক্রিয় থাকা

কত ঘণ্টা ঘুম প্রয়োজন?

প্রাপ্তবয়স্কদের নিয়মিতভাবে প্রতি রাতে অন্তত ৭ ঘণ্টা ঘুমানোর পরামর্শ দিয়েছে American Academy of Sleep Medicine ও Sleep Research Society-এর যৌথ বিশেষজ্ঞ প্যানেল। তবে শুধু ঘুমের সময় নয়, ঘুমের মান, নিয়মিততা ও ঘুমের ব্যাঘাত আছে কি না—এসবও গুরুত্বপূর্ণ।

কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি?

মাঝেমধ্যে ঘুম আসতে দেরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু নিয়মিতভাবে ঘুমাতে সমস্যা হলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। NHLBI-এর তথ্য অনুযায়ী, সপ্তাহে অন্তত ৩ রাত ঘুমাতে বা ঘুম ধরে রাখতে সমস্যা হলে এবং সেটি ৩ মাস বা তার বেশি সময় চললে তাকে দীর্ঘমেয়াদি অনিদ্রার (chronic insomnia) পর্যায়ে বিবেচনা করা হতে পারে।

এ ছাড়া ঘুমের সমস্যা যদি দিনের কাজ, মনোযোগ, কর্মক্ষমতা বা স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় প্রভাব ফেলে, তাহলে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলা উচিত। কারণ অনিদ্রার পেছনে স্ট্রেস ছাড়াও কিছু ওষুধ, শারীরিক সমস্যা বা অন্য কোনো ঘুমের ব্যাধি থাকতে পারে।

সবশেষে মনে রাখা দরকার, ঘুমের সমস্যা হলে নিজে থেকে নিয়মিত ঘুমের ওষুধ শুরু করা সমাধান নয়। দীর্ঘমেয়াদি অনিদ্রার ক্ষেত্রে সমস্যার কারণ খুঁজে বের করে প্রয়োজন অনুযায়ী চিকিৎসা নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।

এক নজরে: ঘুমের আগে যে অভ্যাসগুলো এড়িয়ে চলবেন

অভ্যাসকেন সমস্যা হতে পারে
মোবাইল/কম্পিউটারের স্ক্রিন ঘুমের প্রস্তুতি ও ঘুম-জাগরণ ছন্দে ব্যাঘাত ঘটাতে পারে
বিকেল-সন্ধ্যার পর ক্যাফেইন ক্যাফেইনের প্রভাব ঘুমে বাধা দিতে পারে
ভারী বা বড় খাবার অস্বস্তি ও হজমের সমস্যা তৈরি করতে পারে
অ্যালকোহল ঘুম হালকা করে রাতে ঘুম ভাঙার প্রবণতা বাড়াতে পারে
নিকোটিন উদ্দীপক হিসেবে ঘুমে সমস্যা করতে পারে
ঘুমের ঠিক আগে তীব্র ব্যায়াম কিছু মানুষের ঘুম আসতে দেরি হতে পারে
দীর্ঘ সময় দিনের ঘুম রাতে ঘুমের চাপ কমিয়ে দিতে পারে
অনিয়মিত ঘুমের সময় শরীরের ঘুম-জাগরণ ছন্দ বিঘ্নিত করতে পারে
ঘুম নিয়ে অতিরিক্ত দুশ্চিন্তা মানসিক চাপ বাড়িয়ে ঘুম আরও কঠিন করে তুলতে পারে

তথ্যসূত্র: CDC, National Heart, Lung, and Blood Institute (NIH), Mayo Clinic এবং American Academy of Sleep Medicine-এর প্রকাশিত ঘুমসংক্রান্ত নির্দেশনা ও তথ্য।

FAQ

প্রশ্ন: ঘুমানোর আগে মোবাইল ব্যবহার করলে কি সত্যিই ঘুমে সমস্যা হতে পারে?

উত্তর: দীর্ঘ সময় স্ক্রিন ব্যবহার ও উজ্জ্বল আলো ঘুমের প্রস্তুতিতে বাধা দিতে পারে। CDC ঘুমের অন্তত ৩০ মিনিট আগে ইলেকট্রনিক ডিভাইস বন্ধ করার পরামর্শ দেয়।

প্রশ্ন: রাতে ঘুম ভালো করতে কখন থেকে চা-কফি কমানো উচিত?

উত্তর: নির্দিষ্ট সময় সবার জন্য এক নয়, কারণ ক্যাফেইনের প্রতি সংবেদনশীলতা ভিন্ন। তবে ঘুমের সমস্যা থাকলে বিকেল ও সন্ধ্যার পর ক্যাফেইন এড়িয়ে চলা উপকারী হতে পারে।

প্রশ্ন: ঘুমানোর আগে ভারী খাবার খাওয়া কি ঠিক?

উত্তর: ঘুমের কয়েক ঘণ্টা আগে ভারী বা বড় খাবার এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়। ক্ষুধা লাগলে অল্প পরিমাণ হালকা খাবার নেওয়া যেতে পারে।

প্রশ্ন: ঘুম না এলে কি বিছানায় শুয়ে থাকব?

উত্তর: দীর্ঘ সময় ঘুম না এলে কিছুক্ষণ বিছানা থেকে উঠে শান্ত কোনো কাজ করা যেতে পারে। ঘুমঘুম ভাব এলে আবার বিছানায় যাওয়া যেতে পারে।

প্রশ্ন: কখন ঘুমের সমস্যাকে অনিদ্রা হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া উচিত?

উত্তর: সপ্তাহে অন্তত ৩ রাত ঘুমাতে বা ঘুম ধরে রাখতে সমস্যা হলে এবং তা ৩ মাস বা তার বেশি সময় চললে দীর্ঘমেয়াদি অনিদ্রার বিষয়টি চিকিৎসকের সঙ্গে আলোচনা করা উচিত।

তানভির ইসলাম/

পাঠকের মতামত:

আপনার জন্য বাছাই করা কিছু নিউজ