ঢাকা, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ৪ কার্তিক ১৪৩৩

অনেক খেয়েও ওজন বাড়ে না? কারণ হতে পারে এগুলো

স্বাস্থ্য ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ অক্টোবর ১৯ ১৭:২২:২১
অনেক খেয়েও ওজন বাড়ে না? কারণ হতে পারে এগুলো

প্রতিদিন পেট ভরে খাচ্ছেন, তবু ওজনের কাঁটা নড়ছে না। অনেকের কাছেই এটি বিস্ময়ের, কখনো আবার দুশ্চিন্তার কারণ। চিকিৎসক ও পুষ্টিবিদদের মতে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এর পেছনে থাকে বংশগতি, বিপাকের গতি বা জীবনযাপনের অভ্যাস। তবে কিছু ক্ষেত্রে এটি শরীরের ভেতরের কোনো রোগেরও ইঙ্গিত হতে পারে।

ওজন বাড়ানো নিয়ে ভাবনা শুধু বাড়তি ওজনের মানুষের নয়। অনেক তরুণ ও প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি আছেন, যাঁরা ভালো খাওয়াদাওয়া করেও রোগাটে গড়নের কারণে নানা মন্তব্য শুনতে বাধ্য হন। প্রশ্ন হলো, খাবার তাহলে যাচ্ছে কোথায়?

মূল হিসাবটা কী

ওজন নির্ভর করে শরীরে প্রবেশ করা ক্যালরি আর খরচ হওয়া ক্যালরির ভারসাম্যের ওপর। যিনি যত ক্যালরি খরচ করেন, তার চেয়ে বেশি গ্রহণ না করলে ওজন বাড়ে না। কিন্তু "অনেক খাচ্ছি" ধারণাটি অনেক সময় প্রকৃত হিসাবের সঙ্গে মেলে না। কেউ বড় বড় বেলায় ভরপেট খান, কিন্তু মাঝের সময়ে কিছুই খান না। ফলে দিন শেষে মোট ক্যালরি তাঁর চাহিদার চেয়ে কম থেকে যায়।

সম্ভাব্য সাধারণ কারণ

বংশগত গড়ন। শরীরের গড়ন, মেদ জমার প্রবণতা ও বিপাকের গতিতে বংশগতির বড় ভূমিকা আছে। পরিবারে অনেকে রোগাটে গড়নের হলে আপনিও সেদিকে যেতে পারেন।

দ্রুত বিপাক। কারও শরীর বিশ্রামেও তুলনামূলক বেশি ক্যালরি খরচ করে। বয়স, লিঙ্গ, পেশির পরিমাণ ও শরীরের আকারের ওপর এটি নির্ভর করে।

বেশি শারীরিক পরিশ্রম। নিয়মিত ব্যায়াম, দীর্ঘ সময় হাঁটা, দৌড়ানো কিংবা শারীরিক পরিশ্রমের কাজ ক্যালরি খরচ বাড়ায়। অনেকে এ খরচের হিসাব রাখেন না।

খাবারের ধরন। পরিমাণে বেশি খেলেও খাবার যদি কম ক্যালরির ও বেশি আঁশযুক্ত হয়, যেমন সবজি ও সালাদনির্ভর, তাহলে মোট ক্যালরি কম হতে পারে। আবার অতিরিক্ত পানি বা চা-কফি পান করলে পেট ভরে গিয়ে প্রয়োজনীয় খাবার কম খাওয়া হয়।

ঘুম ও মানসিক চাপ। কম ঘুম ও দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ ক্ষুধা ও হজমকে প্রভাবিত করতে পারে। কারও কারও ক্ষেত্রে এতে খাওয়ার রুচি কমে যায়।

যেসব স্বাস্থ্য সমস্যা ওজন বাড়তে দেয় না

কিছু রোগে বা শারীরিক অবস্থায় প্রচুর খেয়েও ওজন বাড়ে না, উল্টো কমতেও পারে:

হাইপারথাইরয়েডিজম: থাইরয়েড গ্রন্থি অতিরিক্ত সক্রিয় হলে বিপাক দ্রুত হয়, ক্ষুধা বাড়ে কিন্তু ওজন কমে। সঙ্গে বুক ধড়ফড়, হাত কাঁপা, বেশি ঘাম ও অস্থিরতা থাকতে পারে।

ডায়াবেটিস: নিয়ন্ত্রণহীন ডায়াবেটিসে শরীর খাবার থেকে পাওয়া শর্করা ঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারে না। ফলে ওজন কমতে পারে। বারবার পিপাসা ও প্রস্রাব, ক্লান্তি এর লক্ষণ।

হজম ও শোষণজনিত সমস্যা: সিলিয়াক ডিজিজ, ক্রোনস ডিজিজ বা অন্ত্রের অন্যান্য সমস্যায় খাবার থেকে পুষ্টি ঠিকমতো শোষিত না হলে ওজন বাড়ে না।

আরও পড়ুন:

সবসময় ক্লান্ত লাগে কেন? পুরুষদের যে পুষ্টির ঘাটতি হতে পারে

পুরুষদের চুল পড়ার কারণ কী? জানুন চিকিৎসা ও প্রতিকার

হাঁটলে কি ওজন কমে? প্রতিদিন কতক্ষণ হাঁটবেন

পরজীবী সংক্রমণ: পেটে কৃমি বা অন্য পরজীবী থাকলে পুষ্টি শোষণে বাধা আসতে পারে। শিশু ও কিশোরদের ক্ষেত্রে এটি তুলনামূলক বেশি দেখা যায়।

দীর্ঘমেয়াদি সংক্রমণ বা অন্য রোগ: যক্ষ্মাসহ কিছু দীর্ঘস্থায়ী সংক্রমণে ও কিছু ক্যানসারে ওজন কমে যেতে পারে।ক্ষুধামান্দ্য ও মানসিক সমস্যা: বিষণ্নতা, দুশ্চিন্তা বা খাওয়ার অস্বাভাবিকতায় খাদ্যগ্রহণ কমে যেতে পারে।

কিছু ওষুধ: কিছু ওষুধ ক্ষুধা কমাতে বা ওজনে প্রভাব ফেলতে পারে। নিজে থেকে ওষুধ বন্ধ করা উচিত নয়, চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলুন।

কখন সতর্ক হবেন

ওজন বাড়ছে না, এটি একা কোনো রোগের প্রমাণ নয়। তবে নিচের লক্ষণ থাকলে দেরি না করে চিকিৎসকের কাছে যাওয়া ভালো:

কোনো চেষ্টা ছাড়াই ওজন কমে যাওয়া, বিশেষ করে কয়েক মাসে উল্লেখযোগ্য হারে

বুক ধড়ফড়, অতিরিক্ত ঘাম বা হাত কাঁপা

বারবার পাতলা পায়খানা বা পেটব্যথা

ক্রমাগত ক্লান্তি, জ্বর বা রাতে ঘাম

অতিরিক্ত পিপাসা ও ঘন ঘন প্রস্রাব

চিকিৎসক প্রয়োজনে থাইরয়েড, রক্তে শর্করা, রক্তস্বল্পতা ও অন্যান্য পরীক্ষার পরামর্শ দিতে পারেন।

স্বাস্থ্যকরভাবে ওজন বাড়াতে কী করবেন

কারণ নির্ণয়ের পর যাঁদের ওজন সত্যিই কম, তাঁদের জন্য সাধারণ কিছু পরামর্শ রয়েছে:

দিনে তিন বেলার সঙ্গে ছোট ছোট বিরতিতে স্বাস্থ্যকর নাশতা যোগ করুন

ডিম, দুধ, দই, মাছ, মুরগি, ডাল ও বাদামের মতো প্রোটিন ও পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার রাখুন

স্বাস্থ্যকর চর্বি, যেমন বাদাম, অলিভ অয়েল বা অ্যাভোকাডো খাদ্যতালিকায় যোগ করা যায়

ওজন তোলার মতো শক্তি বাড়ানোর ব্যায়াম পেশি গঠনে সাহায্য করে

ভাজাপোড়া ও প্রক্রিয়াজাত খাবার দিয়ে ওজন বাড়ানোর চেষ্টা না করাই ভালো, এতে অন্য স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়তে পারে

খাবারের আগে অতিরিক্ত পানি বা কোমল পানীয় পান করলে ক্ষুধা কমে যেতে পারে, তাই এ বিষয়ে সচেতন থাকুন।

সচরাচর জিজ্ঞাসা (FAQ)

১. অনেক খেয়েও ওজন বাড়ে না কেন?

বংশগত গড়ন, দ্রুত বিপাক, বেশি শারীরিক পরিশ্রম কিংবা খাবারের মোট ক্যালরি কম থাকার কারণে এমন হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে থাইরয়েড, ডায়াবেটিস বা হজমের সমস্যার মতো রোগও এর কারণ।

২. থাইরয়েডের সমস্যা হলে কি ওজন বাড়ে না?

হাইপারথাইরয়েডিজমে বিপাক দ্রুত হয়, তাই ক্ষুধা বাড়লেও ওজন কমতে বা না বাড়তে পারে। রক্তপরীক্ষায় তা নিশ্চিত হওয়া যায়।

৩. কোন লক্ষণ থাকলে চিকিৎসকের কাছে যাওয়া জরুরি?

অকারণে ওজন কমা, বুক ধড়ফড়, ঘন ঘন পাতলা পায়খানা, ক্রমাগত ক্লান্তি, জ্বর বা অতিরিক্ত পিপাসা থাকলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

৪. স্বাস্থ্যকরভাবে ওজন বাড়াতে কী খাওয়া ভালো?

ডিম, দুধ, দই, মাছ, মুরগি, ডাল, বাদাম ও স্বাস্থ্যকর চর্বিযুক্ত খাবার ভালো। সঙ্গে শক্তি বাড়ানোর ব্যায়াম করলে পেশি গঠনে সুবিধা হয়।

৫. শুধু ভাজাপোড়া খেলে কি দ্রুত ওজন বাড়ে?

ক্যালরি বাড়লেও এভাবে ওজন বাড়ানো স্বাস্থ্যসম্মত নয়, কারণ এতে কোলেস্টেরলসহ অন্যান্য ঝুঁকি বাড়তে পারে। পুষ্টিকর খাবারে ধীরে ওজন বাড়ানোই নিরাপদ।

আল-মামুন/

পাঠকের মতামত: