ঢাকা, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬, ৬ কার্তিক ১৪৩৩

নতুন ভোটার হতে লাগবে যেসব কাগজ, জানুন আবেদন পদ্ধতি

জাতীয় ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ অক্টোবর ২১ ১২:৫৮:২৩
নতুন ভোটার হতে লাগবে যেসব কাগজ, জানুন আবেদন পদ্ধতি

নতুন ভোটার হতে চাইলে শুধু জন্মনিবন্ধন সনদ থাকলেই আবেদন সম্পন্ন হবে না। আবেদনকারীর পরিচয়, বয়স, শিক্ষাগত যোগ্যতা ও বর্তমান ঠিকানা যাচাইয়ের জন্য জন্মনিবন্ধন, শিক্ষাগত সনদ, বাবা-মায়ের জাতীয় পরিচয়পত্র এবং ঠিকানার প্রমাণসহ প্রয়োজনীয় নথি প্রস্তুত রাখতে হয়। বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী, নতুন ভোটার নিবন্ধনের জন্য নির্ধারিত ফরম পূরণ করতে হয় এবং যাচাইয়ের অংশ হিসেবে ছবি, আঙুলের ছাপসহ বায়োমেট্রিক তথ্য দিতে হতে পারে। কোন কোন কাগজ লাগবে, তা আগে জেনে নিলে আবেদন প্রক্রিয়ায় অপ্রয়োজনীয় ভোগান্তি কমবে।

নতুন ভোটার হতে কী কী কাগজপত্র লাগে?

বাংলাদেশে নতুন ভোটার নিবন্ধনের ক্ষেত্রে সাধারণত নিচের কাগজপত্রগুলো প্রস্তুত রাখা ভালো। সব আবেদনকারীর জন্য প্রতিটি নথি প্রযোজ্য নয়; বৈবাহিক অবস্থা, শিক্ষাগত যোগ্যতা, ঠিকানা ও ব্যক্তিগত পরিস্থিতি অনুযায়ী কিছু কাগজ অতিরিক্ত লাগতে পারে।

১. অনলাইন জন্মনিবন্ধন সনদ

আবেদনকারীর জন্মতারিখ ও পরিচয় যাচাইয়ের জন্য অনলাইন জন্মনিবন্ধন সনদ প্রয়োজন। জন্মনিবন্ধনের তথ্যের সঙ্গে আবেদনপত্রে দেওয়া নাম, জন্মতারিখ ও বাবা-মায়ের তথ্যের মিল থাকা জরুরি। কোনো ভুল থাকলে আবেদন করার আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তা যাচাই করে নেওয়া ভালো।

২. এসএসসি বা সমমানের সনদ

যাঁরা এসএসসি বা সমমানের পরীক্ষা পাস করেছেন, তাঁদের সনদ প্রস্তুত রাখতে হবে। ২০২৬ সালের ২৯ এপ্রিল নির্বাচন কমিশন নির্দেশ দিয়েছে, আবেদনকারীর মাধ্যমিক বা উচ্চতর শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকলে এসএসসি বা সমমানের সনদ নিবন্ধনের ডেটাবেইসে সংযুক্ত করতে হবে। উচ্চতর ডিগ্রি থাকলেও এসএসসি বা সমমানের সনদ সংরক্ষণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাই শুধু সর্বশেষ ডিগ্রির সনদ নিয়ে গেলে যথেষ্ট নাও হতে পারে।

৩. বাবা-মায়ের জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি

বাবা ও মায়ের জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি প্রস্তুত রাখুন। তাঁদের নাম ও অন্যান্য পরিচয়সংক্রান্ত তথ্য জন্মনিবন্ধন ও শিক্ষাগত সনদের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা হতে পারে। বাবা বা মা মারা গিয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট মৃত্যু সনদ প্রয়োজন হতে পারে।

৪. বর্তমান ঠিকানার প্রমাণ

আবেদনকারী কোথায় বসবাস করেন, তা যাচাইয়ের জন্য নিচের যেকোনো প্রযোজ্য কাগজ প্রস্তুত রাখতে পারেন—

বিদ্যুৎ, পানি বা গ্যাস বিলের কপি;

বাড়িভাড়ার রসিদ, যদি ভাড়া বাসায় থাকেন;

হোল্ডিং ট্যাক্স বা পৌরকর পরিশোধের রসিদ;

চৌকিদারি কর বা স্থানীয়ভাবে গ্রহণযোগ্য অন্য ঠিকানার প্রমাণ।

কোন নথি গ্রহণ করা হবে, তা স্থানীয় নির্বাচন অফিসের নির্দেশনা অনুযায়ী নিশ্চিত করুন।

৫. নাগরিকত্ব বা বাসিন্দা সনদ

প্রয়োজন অনুযায়ী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান, পৌরসভার মেয়র বা সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ড কাউন্সিলরের দেওয়া নাগরিকত্ব বা বাসিন্দা সনদ চাওয়া হতে পারে। বিশেষ করে ঠিকানা বা নাগরিক পরিচয় যাচাইয়ের জন্য স্থানীয় কর্তৃপক্ষের প্রত্যয়ন প্রয়োজন হলে এটি কাজে লাগে।

৬. স্বামী বা স্ত্রীর জাতীয় পরিচয়পত্র ও নিকাহনামা

বিবাহিত আবেদনকারীদের স্বামী বা স্ত্রীর জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে নিকাহনামা প্রস্তুত রাখতে হবে। এসব নথি পারিবারিক পরিচয় ও তথ্য যাচাইয়ে প্রয়োজন হতে পারে।

৭. অন্যান্য প্রাসঙ্গিক কাগজপত্র

আবেদনকারীর পরিস্থিতি অনুযায়ী আরও কিছু নথি প্রয়োজন হতে পারে। যেমন—

পাসপোর্ট বা ড্রাইভিং লাইসেন্স, যদি থাকে;

রক্তের গ্রুপ পরীক্ষার সনদ, যদি চাওয়া হয়;

বাবা-মায়ের মৃত্যু সনদ, প্রযোজ্য ক্ষেত্রে;

দ্বৈত নাগরিকত্ব বা বিশেষ নাগরিকত্বসংক্রান্ত নথি, প্রযোজ্য ক্ষেত্রে।

এগুলো প্রত্যেক আবেদনকারীর জন্য বাধ্যতামূলক—এমন নয়। নিজের ক্ষেত্রে কোনগুলো লাগবে, তা সংশ্লিষ্ট উপজেলা বা থানা নির্বাচন অফিসে যাচাই করে নেওয়া উচিত।

নতুন ভোটার হওয়ার আবেদন কীভাবে করবেন?

নতুন ভোটার নিবন্ধনের প্রক্রিয়া কয়েকটি ধাপে সম্পন্ন করা যায়।

ধাপ ১: অনলাইনে ফরম পূরণ করুন

নির্বাচন কমিশনের জাতীয় পরিচয় নিবন্ধনসংক্রান্ত সেবা পোর্টালে প্রবেশ করুন:

অনলাইন আবেদন: services.nidw.gov.bd

নতুন নিবন্ধনের জন্য নির্ধারিত ফরম-২ পূরণ করতে হয়। নাম, জন্মতারিখ, বাবা-মায়ের তথ্য, ঠিকানা ও অন্যান্য তথ্য জন্মনিবন্ধন এবং শিক্ষাগত সনদের সঙ্গে মিলিয়ে লিখুন।

ধাপ ২: প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংযুক্ত করুন

ফরমের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় নথির কপি সংযুক্ত বা দাখিল করুন। কোনো তথ্যের অমিল থাকলে তা গোপন না করে আগে সংশোধন বা ব্যাখ্যার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিন।

ধাপ ৩: সংশ্লিষ্ট নির্বাচন অফিসে যোগাযোগ করুন

অনলাইনে আবেদন করলেই সব কাজ শেষ হয় না। আবেদন যাচাই, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা এবং পরিচয় নিশ্চিত করার জন্য সংশ্লিষ্ট উপজেলা বা থানা নির্বাচন অফিসে যেতে হতে পারে। স্থানীয় নির্বাচন অফিসের নির্দেশনা অনুযায়ী আবেদনপত্রের প্রিন্ট কপি ও মূল নথি সঙ্গে রাখুন।

ধাপ ৪: ছবি ও বায়োমেট্রিক তথ্য দিন

নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী ছবি তোলা, আঙুলের ছাপ ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় তথ্য নেওয়া হতে পারে। এ জন্য নির্ধারিত তারিখে উপস্থিত থাকুন এবং আবেদনসংক্রান্ত স্লিপ বা প্রয়োজনীয় কাগজ সঙ্গে নিন।

ধাপ ৫: আবেদন ও এনআইডির অবস্থা যাচাই করুন

আবেদন জমা দেওয়ার পর দেওয়া রেফারেন্স বা স্লিপ সংরক্ষণ করুন। আবেদন যাচাই ও নিবন্ধন সম্পন্ন হওয়ার পর নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা অনুযায়ী জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্য বা কার্ড সংগ্রহের প্রক্রিয়া অনুসরণ করুন।

২০২৬ সালে ১৬ বা ১৭ বছর বয়সীদের জন্য কী নিয়ম?

এ বিষয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য মনে রাখা দরকার। নির্বাচন কমিশন ২০২৬ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি ১৬ ও ১৭ বছর বয়সী বাংলাদেশি নাগরিকদের পরিচয় নিবন্ধনসংক্রান্ত পরিপত্র প্রকাশ করেছে। অর্থাৎ, এই বয়সী নাগরিকরাও নির্ধারিত নিয়মে জাতীয় পরিচয় নিবন্ধনের আবেদন করতে পারেন।

তবে জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন করা আর ভোটার হিসেবে ভোট দেওয়ার যোগ্য হওয়া এক বিষয় নয়। সংবিধানের ১২২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তির জন্য ১৮ বছর বয়স পূর্ণ হওয়াসহ অন্যান্য শর্ত প্রযোজ্য। ফলে ১৬ বা ১৭ বছর বয়সে এনআইডি নিবন্ধন করলেও শুধু কার্ড পাওয়ার কারণে ভোট দেওয়ার অধিকার তৈরি হয় না।

নতুন ভোটার হতে কত টাকা লাগে?

নতুন ভোটার নিবন্ধনের জন্য নির্দিষ্ট কোনো ফি প্রযোজ্য কি না, তা নিয়ে বিভ্রান্ত না হয়ে নির্বাচন কমিশনের সরকারি নির্দেশনা অনুসরণ করা উচিত। আবেদন করার আগে সরকারি সেবা পোর্টাল বা সংশ্লিষ্ট নির্বাচন অফিসে খোঁজ নিন। সরকারি নির্ধারিত ফি ছাড়া কাউকে অতিরিক্ত টাকা দেওয়ার আগে তার বৈধতা নিশ্চিত করুন।

অনলাইনে ফরম পূরণ বা প্রিন্ট করার জন্য কোনো কম্পিউটার দোকান অর্থ নিলে সেটি দোকানের সেবামূল্য হতে পারে; তা নির্বাচন কমিশনের সরকারি ফি বলে ধরে নেওয়া যাবে না।

আবেদন করার আগে যে ভুলগুলো এড়িয়ে চলবেন

নতুন ভোটার নিবন্ধনে তথ্যের অমিল থাকলে যাচাইয়ের সময় জটিলতা তৈরি হতে পারে। তাই—

জন্মনিবন্ধন, শিক্ষাগত সনদ ও বাবা-মায়ের এনআইডিতে নামের বানান মিলিয়ে নিন।

জন্মতারিখ অনুমান করে বা ইচ্ছামতো পরিবর্তন করে লিখবেন না।

একই ব্যক্তি হিসেবে একাধিকবার নিবন্ধনের আবেদন করবেন না।

মূল নথি ও প্রয়োজনীয় ফটোকপি আলাদা করে গুছিয়ে রাখুন।

অনলাইন আবেদন ও ব্যক্তিগত তথ্যের রেফারেন্স নম্বর নিরাপদে সংরক্ষণ করুন।

আবেদন জমা দেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট নির্বাচন অফিসের সর্বশেষ নির্দেশনা যাচাই করুন।

নতুন ভোটার হতে সাধারণত অনলাইন জন্মনিবন্ধন সনদ, এসএসসি বা সমমানের সনদ, বাবা-মায়ের এনআইডি এবং বর্তমান ঠিকানার প্রমাণসহ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত রাখতে হয়। বিবাহিত হলে স্বামী বা স্ত্রীর পরিচয়পত্র ও নিকাহনামা এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী অন্যান্য নথিও লাগতে পারে। অনলাইনে ফরম পূরণের পাশাপাশি নির্বাচন অফিসের যাচাই ও বায়োমেট্রিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা জরুরি। সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য তথ্যের জন্য নির্বাচন কমিশনের সরকারি ওয়েবসাইট ও নিজের এলাকার উপজেলা বা থানা নির্বাচন অফিসের নির্দেশনা অনুসরণ করুন।

প্রাসঙ্গিক FAQ

১. নতুন ভোটার হতে সবচেয়ে জরুরি কাগজ কোনগুলো?

অনলাইন জন্মনিবন্ধন সনদ, প্রযোজ্য ক্ষেত্রে এসএসসি বা সমমানের সনদ, বাবা-মায়ের এনআইডির কপি এবং বর্তমান ঠিকানার প্রমাণ প্রস্তুত রাখুন। পরিস্থিতি অনুযায়ী অতিরিক্ত নথি লাগতে পারে।

২. অনলাইনে আবেদন করলেই কি এনআইডি পাওয়া যায়?

না। অনলাইনে ফরম পূরণের পর নথি যাচাই, নির্বাচন অফিসের নির্দেশনা অনুযায়ী উপস্থিতি এবং ছবি ও বায়োমেট্রিক তথ্য দেওয়ার মতো ধাপ সম্পন্ন করতে হতে পারে।

৩. এসএসসি পাস না করলে কি নতুন ভোটার হওয়া যাবে না?

শুধু এসএসসি পাস না করার কারণে ভোটার হওয়ার যোগ্যতা বাতিল হয় না। তবে পরিচয় ও জন্মতারিখ যাচাইয়ের জন্য অন্যান্য প্রাসঙ্গিক নথি দিতে হতে পারে। নিজের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নির্বাচন অফিসে নিশ্চিত করুন।

৪. ১৬ বছর বয়সে কি ভোটার হওয়া যায়?

১৬ বছর বয়সে জাতীয় পরিচয় নিবন্ধনের আবেদন করা যায়। তবে ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়ে ভোট দেওয়ার জন্য ১৮ বছর বয়স পূর্ণ হওয়াসহ আইনগত শর্ত পূরণ করতে হয়।

৫. নতুন ভোটার হতে কোথায় আবেদন করব?

নির্বাচন কমিশনের services.nidw.gov.bd পোর্টালে অনলাইন আবেদন করতে পারেন। প্রয়োজনীয় যাচাই ও পরবর্তী ধাপের জন্য নিজের এলাকার উপজেলা বা থানা নির্বাচন অফিসের নির্দেশনা অনুসরণ করুন।

আল-মামুন/

পাঠকের মতামত: