ঢাকা, শুক্রবার, ৩ জুলাই ২০২৬, ১৯ আষাঢ় ১৪৩৩

মো. রাজীব আলী

সিনিয়র রিপোর্টার

বিক্রি বাড়ল ১০০১%, তবু লোকসানে ওয়াইম্যাক্স!

শেয়ারনিউজ ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ জুলাই ০৩ ১৬:৫৭:১৫

পুঁজিবাজার থেকে মূলধন সংগ্রহ করে ব্যবসা সম্প্রসারণ ও ব্যাংকঋণ শোধ করার মাধ্যমে সুদজনিত খরচ কমানোর লক্ষ্য ছিল ওয়াইম্যাক্স ইলেকট্রোডসের। কিন্তু তালিকাভুক্তির পর বাস্তবতা হয়েছে সম্পূর্ণ বিপরীত—সুদ ব্যয় কমার বদলে কোম্পানিটি এখন তলিয়ে গেছে বিশাল ঋণের বোঝায়, সেই সঙ্গে টালমাটাল হয়ে পড়েছে সামগ্রিক আর্থিক কাঠামো।

২০১৭ সালে আইপিওর মাধ্যমে ১৫ কোটি টাকা তোলে ওয়াইম্যাক্স ইলেকট্রোডস, যার মধ্যে প্রসপেক্টাসে ৫ কোটি টাকা ঋণ পরিশোধে ব্যয় করার প্রতিশ্রুতি ছিল। তবে বাস্তব চিত্র ঠিক তার বিপরীত—২০১৬ সালের জুন পর্যন্ত মাত্র ১৩.০১ কোটি টাকা ঋণ থাকা কোম্পানিটির ঋণ ২০২৪-২৫ অর্থবছর শেষে প্রায় ৩৬৭৬ শতাংশ বেড়ে দাঁড়ায় ৪৯১.২৭ কোটি টাকায়। এর প্রভাবে সুদ ব্যয়ও লাফিয়ে বেড়েছে—২০১৫-১৬ অর্থবছরে ১.০৯ কোটি টাকা থেকে ১৬৮৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দাঁড়িয়েছে ১৯.৪৪ কোটি টাকায়।

আশ্চর্যজনকভাবে, ঋণ বাড়ার পাশাপাশি কোম্পানির বিক্রিও বেড়েছে চোখে পড়ার মতো। আইপিও-পূর্ব ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৪১.০২ কোটি টাকা থাকা বিক্রি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে পৌঁছায় ৪৫১.৫০ কোটি টাকায়—প্রায় ১০০১ শতাংশ প্রবৃদ্ধি। তবে এই বিপুল বিক্রি বৃদ্ধি সত্ত্বেও মুনাফা ধরে রাখতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে কোম্পানিটি। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৬.৪২ কোটি টাকা নিট মুনাফা থাকা প্রতিষ্ঠানটির মুনাফা ২০২৪-২৫ অর্থবছরে নেমে আসে মাত্র ২০ লাখ টাকায়, আর ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথমার্ধেই গুনতে হয় ১.০২ কোটি টাকার লোকসান।

মুনাফায় এই ধস শেয়ারহোল্ডারদের লভ্যাংশপ্রাপ্তিকেও প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে। বিগত ছয় বছরের মধ্যে ২০২১, ২০২৩ ও ২০২৫ সালে কোনো লভ্যাংশই পাননি বিনিয়োগকারীরা; একমাত্র ব্যতিক্রম ছিল ২০২৪ সাল, যেখানে মাত্র ৩ শতাংশ লভ্যাংশ মিলেছিল। প্রতিষ্ঠার পর থেকে গত ২০ বছরে কোনো পুঞ্জীভূত মুনাফাই অর্জন করতে পারেনি কোম্পানিটি—উল্টো ৪৯.১৭ কোটি টাকার পুঞ্জীভূত লোকসানের কারণে ৭৩.০৮ কোটি টাকা পরিশোধিত মূলধনের বিপরীতে নিট সম্পদ নেমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ২৩.৯২ কোটি টাকায়, যা শেয়ারপ্রতি মূল্যে দাঁড়ায় মাত্র ৩.২৭ টাকা।

এই আর্থিক সংকটের পাশাপাশি নিরীক্ষা প্রতিবেদনেও উঠে এসেছে একাধিক গুরুতর অসংগতির চিত্র। ১৮৯ কোটি ২২ লাখ টাকার গ্রাহক পাওনা এবং ২০৪ কোটি ৮৭ লাখ টাকার মজুদ পণ্যের সঠিক ও পর্যাপ্ত দলিলপত্র উপস্থাপনে ব্যর্থ হয়েছে কোম্পানিটি, ফলে এসবের প্রকৃত অস্তিত্ব যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

আরও উদ্বেগজনক হলো, ১০ কোটি ৭১ লাখ টাকার একটি স্থায়ী সম্পদকে বছরের পর বছর ধরে "নির্মাণাধীন" দেখিয়ে রাখার বিষয়টি, পাশাপাশি শ্রমিক কল্যাণ তহবিলের (ডব্লিউপিপিএফ) ৫৮ লাখ টাকা কর্মীদের মাঝে বণ্টন না করে শ্রম আইন লঙ্ঘনের অভিযোগও তুলেছেন নিরীক্ষক।

এসব অনিয়ম নিয়ে কোম্পানি সচিব দেবাশীস সরকারের বক্তব্য জানতে গত এপ্রিল ও মে মাসে একাধিকবার ফোন ও ই-মেইলে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

বাজার-সংশ্লিষ্টদের মতে, আইপিওর সময় ঋণ কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে উল্টো বিশাল ঋণের বোঝা তৈরি করা এবং নিরীক্ষায় এত বড় গরমিল উঠে আসা—দুটোই বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে সুস্পষ্ট প্রতারণার শামিল। বিক্রি অস্বাভাবিক হারে বাড়লেও লোকসান হওয়া এবং লভ্যাংশ বন্ধ থাকার বিষয়টি সন্দেহজনক বলে মনে করছেন তারা, এবং এ বিষয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থার দ্রুত ও গভীর তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।

তানভির ইসলাম/

পাঠকের মতামত:

আপনার জন্য বাছাই করা কিছু নিউজ

এলপিজির দামে বড় স্বস্তি, জানুন নতুন মূল্য তালিকা

এলপিজির দামে বড় স্বস্তি, জানুন নতুন মূল্য তালিকা

দেশের এলপিজি ব্যবহারকারীদের জন্য এলো স্বস্তির খবর। ভোক্তা পর্যায়ে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের নতুন মূল্য উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি... বিস্তারিত