ঢাকা, রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৫ আশ্বিন ১৪৩৩

দুই বছরের বেশি আর্থিক প্রতিবেদন নেই, সিঅ্যান্ডএতে ডিএসইর পরিদর্শন

শেয়ারনিউজ ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ সেপ্টেম্বর ২০ ২০:৪০:০৬
দুই বছরের বেশি আর্থিক প্রতিবেদন নেই, সিঅ্যান্ডএতে ডিএসইর পরিদর্শন

সিঅ্যান্ডএ টেক্সটাইলস লিমিটেডের মালিকানায় সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অংশ ৮২.৮৬ শতাংশ। অথচ দীর্ঘ সময় ধরে কোম্পানিটির আর্থিক ও পরিচালন কার্যক্রমের হালনাগাদ তথ্য মিলছে না। সর্বশেষ ২০২৪ সালের মার্চে শেষ হওয়া তৃতীয় প্রান্তিকের প্রতিবেদন প্রকাশের পর আর কোনো ত্রৈমাসিক আর্থিক প্রতিবেদন দেয়নি প্রতিষ্ঠানটি। এমন পরিস্থিতিতে কোম্পানিটির প্রকৃত অবস্থা সরেজমিনে যাচাই করতে পরিদর্শনের উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই)।

ডিএসইর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে চলতি সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে এ পরিদর্শনের অনুমোদন দিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি)। সংশ্লিষ্ট একটি চিঠিতে এ অনুমোদনের বিষয়টি জানা গেছে।

পরিদর্শনের পেছনে যে বিষয়গুলো

দীর্ঘদিন ধরে সিঅ্যান্ডএ টেক্সটাইলস নিয়ন্ত্রক সংস্থার বিভিন্ন বিধিবিধান পরিপালনে ব্যর্থ হচ্ছে। একই সময়ে কোম্পানির কার্যক্রম এবং আর্থিক অবস্থার প্রয়োজনীয় তথ্যও নিয়মিত প্রকাশ হয়নি। ফলে প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

ডিএসইর এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, বিএসইসির অনুমোদন পাওয়ার পর কোম্পানিটির বর্তমান কার্যক্রমের অবস্থা জানতেই পরিদর্শনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

নির্ধারিত সময়ে বাধ্যতামূলক বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) করতে না পারার কারণেও কোম্পানিটির ওপর নিয়ন্ত্রক জটিলতা তৈরি হয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে ডিএসই সিঅ্যান্ডএ টেক্সটাইলসকে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে নামিয়ে দেয়।

একসময় মুনাফায় ছিল কোম্পানি

তথ্য প্রকাশে দীর্ঘ বিরতির আগে পাওয়া হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ অর্থবছরে সিঅ্যান্ডএ টেক্সটাইলসের নিট মুনাফা ছিল ৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা। ওই বছর শেয়ারহোল্ডারদের দশমিক ৫ শতাংশ ক্যাশ ডিভিডেন্ড দেওয়া হয়।

এরপর নতুন ব্যবস্থাপনার অধীনে উৎপাদন কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর ২০২৪ অর্থবছরের প্রথম নয় মাসে কোম্পানিটির নিট মুনাফা বেড়ে ৫ কোটি ৫০ লাখ টাকায় দাঁড়ায়।

তবে এই আর্থিক ফলাফলের পর কোম্পানিটির নিয়মিত ত্রৈমাসিক আর্থিক প্রতিবেদন আর প্রকাশিত হয়নি। ফলে পরবর্তী সময়ে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ও পরিচালন অবস্থার কী পরিবর্তন হয়েছে, সে বিষয়ে বিনিয়োগকারীদের কাছে প্রয়োজনীয় তথ্য নেই।

আইপিওর পরই শুরু হয় সংকট

শেয়ারবাজারে কোম্পানিটির যাত্রা শুরু হয়েছিল ২০১৫ সালে। ওই বছর প্রাথমিক গণপ্রস্তাবের (আইপিও) মাধ্যমে ৪৫ কোটি টাকা সংগ্রহ করে সিঅ্যান্ডএ টেক্সটাইলস। আইপিও প্রসপেক্টাসে এই অর্থের মধ্যে ৩০ কোটি ৮৭ লাখ টাকা ঋণ পরিশোধ ও ব্যবসা সম্প্রসারণে ব্যবহারের কথা উল্লেখ করা হয়েছিল।

কিন্তু ২০১৭ সালে কোম্পানিটির পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন আসে। বড় ধরনের ঋণ কেলেঙ্কারির পর মূল উদ্যোক্তারা দেশ ছাড়লে প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম ভেঙে পড়ে। একই বছরের জুনে সংস্কারকাজের কথা জানিয়ে উৎপাদন বন্ধ করে দেওয়া হয়। এরপর কয়েক বছর কোম্পানিটির কার্যালয়ও বন্ধ ছিল।

২০২০ সালে খেলাপি ঋণের একটি মামলায় কোম্পানিটির সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক রুকশানা মোরশেদকে চট্টগ্রাম থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।

পর্ষদ পুনর্গঠন, পরে নতুন ব্যবস্থাপনা

বন্ধ হয়ে যাওয়া প্রতিষ্ঠানটিকে পুনরায় চালুর উদ্যোগ আসে কয়েক বছর পর। ২০২১ সালে আলিফ গ্রুপ সিঅ্যান্ডএ টেক্সটাইলস অধিগ্রহণ করে। নতুন ব্যবস্থাপনা কোম্পানিতে মূলধন বিনিয়োগ করার পর পরের বছর, অর্থাৎ ২০২২ সালে, উৎপাদন আবার শুরু হয়।

এর আগে ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে কোম্পানিটিকে পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ হিসেবে বিএসইসি পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন করেছিল। ওই সময় সাতজন পরিচালক নিয়োগের মাধ্যমে কোম্পানির পরিচালনা কাঠামো নতুন করে সাজানো হয়।

নতুন ব্যবস্থাপনা দায়িত্ব নেওয়ার পর আদালতের অনুমতি নিয়ে বকেয়া একাধিক এজিএমও আয়োজন করা হয়। ২০২৩ অর্থবছর পর্যন্ত এজিএম সম্পন্ন করা হয়েছিল।

একীভূত হওয়ার পরিকল্পনাও থেমে আছে

আলিফ গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান আলিফ ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের সঙ্গে সিঅ্যান্ডএ টেক্সটাইলসকে একীভূত করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। এ জন্য ব্যাংক, অন্যান্য ঋণদাতা এবং শেয়ারহোল্ডারদের অনুমোদন পাওয়ার কথা ছিল। তবে সেই একীভূতকরণ এখনো সম্পন্ন হয়নি বলে জানা গেছে।

অন্যদিকে, কোম্পানিটির শেয়ার মালিকানার বড় অংশই সাধারণ বিনিয়োগকারীদের হাতে। উদ্যোক্তা-পরিচালকদের মালিকানা মাত্র ৭.১০ শতাংশ। ফলে কোম্পানিটির বর্তমান কার্যক্রম ও আর্থিক অবস্থার তথ্য দীর্ঘদিন ধরে অনুপস্থিত থাকায় সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অনিশ্চয়তাই বেশি।

শেয়ার বিক্রি নিয়ে বিএসইসির তদন্ত

সিঅ্যান্ডএ টেক্সটাইলসের শেয়ার লেনদেনের একটি বিষয়েও তদন্ত করেছিল বিএসইসি। কমিশনের তদন্তে উঠে আসে, রুকশানা মোরশেদ, পরিচালক শারমিন আক্তার লভলী এবং বাংলাদেশ শুজ ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড কোনো পূর্বঘোষণা ছাড়াই কোম্পানিটির প্রায় ১ কোটি ২২ লাখ শেয়ার বিক্রি করেছিলেন।

তদন্ত অনুযায়ী, ওই শেয়ার বিক্রির মাধ্যমে তারা প্রায় ১২ কোটি টাকা আয় করেন।

এখন দীর্ঘ সময়ের তথ্যঘাটতি, নিয়ন্ত্রক বিধি পরিপালনে ব্যর্থতা এবং কোম্পানিটির বর্তমান কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্নের মধ্যে ডিএসইর পরিদর্শন হতে যাচ্ছে। বিএসইসির অনুমোদনের পর এই পরিদর্শনের মাধ্যমেই প্রতিষ্ঠানটির বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে সরাসরি তথ্য সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

আল-সাদ/

পাঠকের মতামত:

আপনার জন্য বাছাই করা কিছু নিউজ