৬৮ বছরে হানিফ সংকেত, জন্মদিনেও ভাবনায় যে অসমাপ্ত কাজ
চার দশকের বেশি সময় ধরে একটি টেলিভিশন অনুষ্ঠানকে দর্শকের কাছে প্রাসঙ্গিক রাখা, বিনোদনের মধ্য দিয়ে সমাজের অসংগতি তুলে ধরা এবং প্রচারের বাইরে থাকা ভালো কাজগুলোকে মানুষের সামনে নিয়ে আসা—হানিফ সংকেতের কর্মজীবনের বড় অংশজুড়েই রয়েছে এসব উদ্যোগ। দীর্ঘ এই পথচলায় রাষ্ট্রীয় সম্মাননাও পেয়েছেন তিনি। তবু নিজের অর্জনের হিসাবের চেয়ে সামনে পড়ে থাকা কাজগুলোই বেশি ভাবায় তাঁকে। শুক্রবার, ২৩ অক্টোবর, ৬৮তম জন্মদিনে পৌঁছেও তাঁর ভাবনায় সেই অসমাপ্ত কাজের প্রসঙ্গই গুরুত্বপূর্ণ।
১৯৫৮ সালের ২৩ অক্টোবর বরিশালে জন্মগ্রহণ করেন হানিফ সংকেত। উপস্থাপক, নির্মাতা ও লেখক হিসেবে পরিচিত এই ব্যক্তিত্বের নামের সঙ্গে সবচেয়ে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে আছে ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’। ১৯৮৯ সালের মার্চে বাংলাদেশ টেলিভিশনে যাত্রা শুরু করা অনুষ্ঠানটি দীর্ঘ সময় ধরে দর্শকের আগ্রহ ধরে রেখেছে। বিনোদনের মাধ্যম এবং দর্শকের অভ্যাসে পরিবর্তন এলেও নিজের স্বতন্ত্র উপস্থাপনা ও বিষয় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানটির আলাদা পরিচয় বজায় রেখেছেন তিনি।
জন্মদিনকে ঘিরে নিজের অনুভূতি জানাতে গিয়ে কয়েক বছর আগে প্রথম আলোকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে হানিফ সংকেত বলেছিলেন, ‘আমার কাছে সব দিনই সমান, বরং দিনটি এলে আমার একটু খারাপই লাগে। মনে হয়, জীবন থেকে একটি বছর চলে গেল। অনেক কিছু করার বাকি আছে।’
এই বক্তব্যেই ধরা পড়ে জন্মদিন নিয়ে তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি। বড় আয়োজনের পরিবর্তে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটাতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন তিনি। স্ত্রী, সন্তান ও স্বজনদের শুভেচ্ছার পাশাপাশি দর্শকের ভালোবাসা ও দোয়াকেও বড় প্রাপ্তি হিসেবে দেখেন। জন্মদিন তাঁর কাছে তাই কেবল বয়স বাড়ার উপলক্ষ নয়; পেছনে ফেলে আসা সময়, অর্জন এবং সামনে এগিয়ে নেওয়ার মতো কাজগুলো পর্যালোচনারও সময়।
রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির পাশে দর্শকের ভালোবাসা
হানিফ সংকেতের দীর্ঘ কর্মজীবনে যুক্ত হয়েছে একাধিক সম্মাননা। ২০১০ সালে তিনি একুশে পদক পান। জাতীয় পরিবেশ পদকও অর্জন করেছেন তিনি। তাঁর নির্মিত ‘ইত্যাদি’ একাধিকবার মেরিল-প্রথম আলো পুরস্কারে সেরা টেলিভিশন অনুষ্ঠান হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।
এ বছর তাঁর অর্জনের তালিকায় যুক্ত হয়েছে স্বাধীনতা পুরস্কার ২০২৬। সংস্কৃতিতে অবদানের জন্য রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ বেসামরিক এই সম্মাননা পেয়েছেন তিনি। টেলিভিশন বিনোদন ও সামাজিক সচেতনতামূলক কাজে চার দশকের বেশি সময় ধরে তাঁর ভূমিকা নতুন করে আলোচনায় এসেছে এই স্বীকৃতির মধ্য দিয়ে।
পুরস্কার ঘোষণার পর প্রথম আলোর সঙ্গে আলাপচারিতায় হানিফ সংকেত জানিয়েছিলেন, রাষ্ট্রীয় সম্মাননা আনন্দের হলেও মানুষের ভালোবাসাই তাঁর কাছে সবচেয়ে বড় পুরস্কার। অর্থাৎ অর্জনের স্বীকৃতি গুরুত্বপূর্ণ হলেও কাজের মধ্য দিয়ে মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেওয়ার চেষ্টাকে তিনি বেশি গুরুত্ব দেন।
দর্শকের সঙ্গে দীর্ঘদিনের সম্পর্ক তাঁর কাছে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। একটি অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে বছরের পর বছর যে আস্থা তৈরি হয়েছে, সেটিকে নিজের পথচলার বড় অর্জন হিসেবে দেখেন তিনি। রাষ্ট্রীয় পুরস্কার সেই যাত্রায় নতুন স্বীকৃতি যোগ করলেও কাজ করে যাওয়ার প্রেরণা হিসেবে দর্শকের ভালোবাসাকেই সামনে রাখেন।
‘ইত্যাদি’ কেন শুধু বিনোদনের অনুষ্ঠান নয়
হানিফ সংকেতের কাজের ধরন বুঝতে হলে ‘ইত্যাদি’র বিষয়বৈচিত্র্য ও নির্মাণপ্রক্রিয়ার দিকে তাকাতে হয়। হাস্যরস, ব্যঙ্গ, গান, অভিনয়, তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদন এবং সামাজিক সচেতনতার বিষয় একত্র করে অনুষ্ঠানটি নিজস্ব একটি ধারা তৈরি করেছে। এর মাধ্যমে যেমন বিনোদন দেওয়া হয়, তেমনি সমাজের নানা অসংগতিও তুলে ধরা হয়।
অনুষ্ঠানটির উপস্থাপনায় হানিফ সংকেতের স্পষ্ট উচ্চারণ, ছন্দময় কথন, শব্দের ব্যবহার এবং পরিমিত রসবোধ বিশেষভাবে লক্ষণীয়। ছোট্ট একটি বাক্য কিংবা ব্যঙ্গাত্মক মন্তব্যের মধ্য দিয়েও তিনি বড় কোনো সামাজিক সমস্যার দিকে দর্শকের দৃষ্টি ফেরান। তাঁর উপস্থাপনার এই বৈশিষ্ট্যই ‘ইত্যাদি’কে অন্য আয়োজন থেকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে।
পরিবারের বিভিন্ন বয়সী সদস্য একসঙ্গে বসে দেখতে পারেন—এমন অনুষ্ঠান হিসেবেও ‘ইত্যাদি’র পরিচিতি রয়েছে। এতে হাস্যরস থাকলেও অশ্লীলতার আশ্রয় নেওয়া হয় না; ব্যঙ্গ থাকলেও বিদ্বেষ ছড়ানো এর উদ্দেশ্য নয়। একই সঙ্গে সমাজের অনিয়ম তুলে ধরা এবং ভালো কাজের স্বীকৃতি দেওয়ার চর্চা অনুষ্ঠানটির দীর্ঘদিনের বৈশিষ্ট্য।
নিজের কাজের শক্তি সম্পর্কে প্রথম আলোকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে হানিফ সংকেত বলেছিলেন, ‘এটার শক্তি হচ্ছে, অনুষ্ঠানের প্রতি আমার ভালোবাসা। আমার দায়বদ্ধতা, একাগ্রতা ও আন্তরিকতা; সঙ্গে একটুখানি মেধা হয়তো আছে।’
অনুষ্ঠানটির ক্ষেত্রে সংখ্যার চেয়ে মানকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথাও স্পষ্ট করেছেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, ‘আমি কোয়ান্টিটিতে না, কোয়ালিটিতে বিশ্বাস করি।’ এই দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে যুক্ত রয়েছে প্রতিটি পর্বের জন্য প্রয়োজনীয় গবেষণা, বিষয় নির্বাচন এবং পরিকল্পনা।
দেশের নানা প্রান্তের গল্প তুলে আনার পরিকল্পনা
‘ইত্যাদি’র অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, দেশের বিভিন্ন এলাকার ইতিহাস, সংস্কৃতি ও মানুষের জীবনকে অনুষ্ঠানের অংশ করে তোলা। নব্বইয়ের দশক থেকে স্টুডিওর বাইরে গিয়ে বিভিন্ন স্থানে অনুষ্ঠান ধারণের যে উদ্যোগ শুরু হয়েছিল, তা এখনো অব্যাহত রয়েছে।
অনুষ্ঠানের মঞ্চ কখনো তৈরি হয় নদীর তীরে, কখনো ঐতিহাসিক স্থাপনার সামনে, আবার কখনো প্রাচীন কোনো জনপদে। স্থান নির্বাচনের সঙ্গে যুক্ত থাকে সেই এলাকার ইতিহাস, লোকসংগীত, সংস্কৃতি, দর্শনীয় স্থান এবং মানুষের জীবনসংগ্রামের গল্প। ফলে দর্শক শুধু বিনোদন পান না, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পরিচয় সম্পর্কেও জানতে পারেন।
এ ধরনের আয়োজনের আগে হানিফ সংকেত প্রস্তুতির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন। কোনো জেলায় অনুষ্ঠান করার পরিকল্পনা হলে প্রথমে সেখানকার ইতিহাস ও সংস্কৃতি নিয়ে বই পড়েন এবং তথ্য সংগ্রহ করেন। প্রাথমিক অনুসন্ধানের জন্য প্রতিনিধি পাঠানোর পর নিজেও জায়গাটি ঘুরে দেখেন। এরপর অনুষ্ঠানের বিষয়বস্তু ও আয়োজন চূড়ান্ত করার কাজ এগোয়।
মিরপুরে তাঁর প্রতিষ্ঠান ফাগুন অডিও ভিশনের কার্যালয়েও দীর্ঘদিনের এই প্রস্তুতি ও কাজের ছাপ রয়েছে। ইতিহাস, সাহিত্য ও সংস্কৃতির বই দিয়ে সাজানো কক্ষের পাশাপাশি শিল্পীদের পোশাক রাখার আলাদা ব্যবস্থা রয়েছে সেখানে। সংরক্ষিত আছে পুরোনো অনুষ্ঠানগুলোর বিভিন্ন স্মারকও।
জ্ঞান অর্জন এবং শব্দভান্ডার সমৃদ্ধ করার জন্য নিয়মিত পড়াশোনার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন হানিফ সংকেত। তাঁর ভাষায়, ‘নিজেকে সমৃদ্ধ করার জন্য পড়তে হয়। শব্দভান্ডার বাড়ানোর জন্যও পড়া জরুরি।’
ফজলে লোহানীর কাছ থেকে পাওয়া শিক্ষা
টেলিভিশনে হানিফ সংকেতের প্রাথমিক পথচলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন সাংবাদিক ও উপস্থাপক ফজলে লোহানী। তাঁর জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘যদি কিছু মনে না করেন’-এর সঙ্গে যুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে হানিফ সংকেতের টেলিভিশনজীবনের শুরু। সেখানে কাজ করতে গিয়ে অনুষ্ঠান পরিকল্পনা, লেখালেখি, উপস্থাপনা এবং দর্শকের সঙ্গে যোগাযোগের বিভিন্ন দিক শেখার সুযোগ পান তিনি।
ফজলে লোহানীর সঙ্গে সম্পর্কের কথা বলতে গিয়ে এক সাক্ষাৎকারে হানিফ সংকেত তাঁকে বাংলাদেশের টেলিভিশন সাংবাদিকতার জনক এবং টেলিভিশনের প্রথম সুপারস্টার হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। দীর্ঘদিনের কাজের সম্পর্ক একপর্যায়ে বন্ধুত্ব ও অভিভাবকত্বের সম্পর্কে রূপ নেয়।
ফজলে লোহানীর সঙ্গে আড্ডা, আলোচনা এবং কাজের অভিজ্ঞতা পরবর্তী সময়ে হানিফ সংকেতের নিজস্ব উপস্থাপনার ধরন গড়ে তুলতে সহায়তা করে। সেই অভিজ্ঞতার সঙ্গে নিজের পর্যবেক্ষণ, রসবোধ ও সৃজনশীলতা মিলিয়ে তৈরি করেন স্বতন্ত্র পরিচয়।
১৯৮৫ সালে ফজলে লোহানীর মৃত্যুর পর ‘ঝলক’ নামের ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান দিয়ে একক উপস্থাপনা শুরু করেন হানিফ সংকেত। ১৯৮৭ সালে ‘কথার কথা’ অনুষ্ঠানের উপস্থাপক হিসেবেও দর্শকের সামনে আসেন তিনি। এরপর ১৯৮৯ সালের মার্চে বাংলাদেশ টেলিভিশনে শুরু হয় ‘ইত্যাদি’। সেই অনুষ্ঠানই পরবর্তী সময়ে তাঁর কর্মজীবনের কেন্দ্রীয় পরিচয় হয়ে ওঠে।
সামাজিক পরিবর্তনের বার্তা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা
সমাজের অনিয়ম, দুর্নীতি, ভণ্ডামি ও অসংগতিকে ব্যঙ্গের মাধ্যমে তুলে ধরলেও হানিফ সংকেতের কাজের পরিধি সমস্যার চিত্র দেখানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ‘ইত্যাদি’র মাধ্যমে এমন অনেক মানুষের গল্প সামনে এসেছে, যাঁরা নীরবে সমাজের কল্যাণে কাজ করে যাচ্ছেন।
কেউ শিক্ষার প্রসারে ভূমিকা রাখছেন, কেউ পরিবেশ রক্ষায় কাজ করছেন, আবার কেউ অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছেন। প্রচারের আলো থেকে দূরে থাকা এসব মানুষের কাজ বৃহত্তর দর্শকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করেছে অনুষ্ঠানটি।
হানিফ সংকেত বিভিন্ন সময়ে বইপ্রেমী পলান সরকার, তালগাছ রোপণকারী গহের আলী এবং ‘ভালো কাজের হোটেল’-এর উদ্যোক্তাদের কথা তুলে ধরেছেন। তাঁদের উদ্যোগ পরিচিতি পাওয়ার পর অনেকে নতুন স্বীকৃতি ও সহযোগিতা পেয়েছেন।
কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলের একটি ভাসমান স্কুলের সঙ্গেও যুক্ত রয়েছে ‘ইত্যাদি’র সহযোগিতার স্মৃতি। সেখানকার শিশুদের যাতায়াত এবং পড়াশোনার পরিবেশ উন্নত করতে অনুষ্ঠানের পক্ষ থেকে সহায়তা করা হয়েছিল। পরে স্কুলটি পরিদর্শন করে শিশুদের আনন্দ দেখে আবেগাপ্লুত হয়েছিলেন হানিফ সংকেত।
এ ধরনের অভিজ্ঞতা তাঁর কাছে কাজ চালিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা। বিনোদনের মাধ্যমে ইতিবাচক সামাজিক বার্তা পৌঁছানো সম্ভব বলে বিশ্বাস করেন তিনি। তবে সেই বার্তা যেন সরাসরি বক্তৃতার মতো না হয়ে ওঠে, সে বিষয়েও সতর্ক থাকেন। শিক্ষা, তথ্য ও বিনোদনকে একসঙ্গে উপস্থাপন করাই তাঁর নির্মাণভাবনার অন্যতম ভিত্তি।
নাটক, গান ও বইয়েও রয়েছে স্বতন্ত্র পরিচয়
উপস্থাপনার পাশাপাশি পরিচালনা, প্রযোজনা, অভিনয়, গান লেখা ও সুর করার কাজেও যুক্ত হানিফ সংকেত। ‘ইত্যাদি’তে প্রচারিত বিভিন্ন অঞ্চলভিত্তিক গানের সুর করেছেন তিনি; কিছু গানে কণ্ঠও দিয়েছেন। অনুষ্ঠানটির গান, নৃত্য, নাট্যাংশ ও প্রতিবেদনসহ বিভিন্ন অংশের পরিকল্পনা ও তত্ত্বাবধানেও তাঁর ভূমিকা রয়েছে।
নাট্যনির্মাতা হিসেবেও পরিচিত তিনি। তাঁর নির্মিত নাটকের মধ্যে রয়েছে ‘আয় ফিরে তোর প্রাণের বারান্দায়’, ‘দুর্ঘটনা’, ‘তোষামোদে খোশ আমোদে’, ‘কিংকর্তব্য’ এবং ‘শেষে এসে অবশেষে’। নাটকের পাশাপাশি চলচ্চিত্রেও অভিনয়ের অভিজ্ঞতা রয়েছে তাঁর।
লেখালেখির ক্ষেত্রেও নিজের রসবোধ ও পর্যবেক্ষণকে কাজে লাগিয়েছেন হানিফ সংকেত। রম্যরচনার মধ্য দিয়ে সমাজের নানা অসংগতি তুলে ধরেছেন। তাঁর প্রকাশিত বইয়ের মধ্যে রয়েছে ‘চৌচাপটে’, ‘এপিঠ ওপিঠ’, ‘ধন্যবাদ’, ‘অকাণ্ড কাণ্ড’, ‘খবরে প্রকাশ’ ও ‘প্রতি ও ইতি’। বইগুলোর নামেই শব্দের খেলা ও রসিকতার বৈশিষ্ট্য দেখা যায়। প্রথম আলোসহ বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে সমসাময়িক বিষয় নিয়ে কলামও লেখেন তিনি।
এতগুলো পরিচয় থাকা সত্ত্বেও দর্শকের কাছে তাঁর প্রধান পরিচিতি ‘ইত্যাদি’র উপস্থাপক ও নির্মাতা হিসেবে। অনুষ্ঠানটির সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ সম্পর্কই সেই পরিচয়কে দৃঢ় করেছে।
ডিজিটাল প্রতিযোগিতায় সাফল্যের মাপকাঠি কী
ইউটিউব, ফেসবুকসহ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের বিস্তারে এখন অল্প সময়ে অনেক দর্শকের কাছে পৌঁছানোর সুযোগ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে বেড়েছে ভিউ অর্জন এবং ভাইরাল হওয়ার প্রতিযোগিতা। এই পরিস্থিতিতে কোনো আয়োজন কতজন দেখেছেন, সেটি আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে উঠেছে।
তবে হানিফ সংকেত মনে করেন, দর্শকসংখ্যা দিয়ে এককভাবে কাজের মান বিচার করা যায় না। তাঁর ভাষায়, ‘ভিউ মানেই কিন্তু মান নয়।’
তাঁর দৃষ্টিতে, সাময়িক আলোচনায় আসার চেয়ে দর্শকের মনে স্থায়ী জায়গা তৈরি করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। একটি আয়োজন মানুষকে কী দিচ্ছে, কতটা মনে থাকছে এবং সমাজে তার কী প্রভাব পড়ছে—এসব বিষয়ও বিবেচনায় রাখা প্রয়োজন।
প্রযুক্তির পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার গুরুত্ব তিনি অস্বীকার করেন না। তবে প্রযুক্তির পাশাপাশি মননশীলতা, নৈতিকতা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতাকেও সমান গুরুত্ব দেন। ‘ইত্যাদি’কে পরিবারের সদস্যদের একসঙ্গে বসার উপলক্ষ হিসেবে দেখার পেছনেও রয়েছে এই দর্শন। দীর্ঘদিন ধরে দর্শকের আস্থা ধরে রাখাই তাঁর কাছে বড় বিষয়।
জন্মদিনে সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কাজ করার সামর্থ্য কমে আসতে পারে—এমন ভাবনা তাঁকে তাড়া করে বলে সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন হানিফ সংকেত। সে কারণেই যত দিন সম্ভব কাজ করে যেতে চান তিনি। দেশের আরও বিভিন্ন অঞ্চলে যাওয়ার পাশাপাশি প্রচারের আড়ালে থাকা মানুষের জীবন ও উদ্যোগ তুলে ধরার আগ্রহ রয়েছে তাঁর।
একটি অনুষ্ঠান দীর্ঘ সময় ধরে চালিয়ে যাওয়ার পেছনে নিজের নিষ্ঠা, সততা, আন্তরিকতা এবং দর্শকের ভালোবাসাকে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে দেখেন তিনি। ‘ইত্যাদি’ কত দিন চালিয়ে যাবেন, এমন প্রশ্নের জবাবে প্রথম আলোকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘দর্শক যত দিন চাইবেন এবং যত দিন আমার অনুষ্ঠান করার সক্ষমতা থাকবে, তত দিন ইত্যাদি করে যাব।’
শুক্রবারের ৬৮তম জন্মদিনে তাই তাঁর কর্মজীবনের অর্জন ও স্বীকৃতির পাশাপাশি সামনে থাকা কাজগুলোও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। চার দশকের বেশি সময় ধরে যাঁদের হাসিয়েছেন, ভাবিয়েছেন এবং দেশের নানা প্রান্তের মানুষের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন, সেই দর্শকেরাই তাঁর দীর্ঘ পথচলার প্রধান অনুপ্রেরণা।
হানিফ সংকেতের জন্মদিনের তাৎপর্য এখানেই—পেরিয়ে আসা বছরগুলোর হিসাবের পাশাপাশি তাঁর ভাবনায় রয়েছে আরও কাজ করার আকাঙ্ক্ষা। আর সেই কাজের কেন্দ্রে আছে দর্শকের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা, অজানা মানুষের গল্প সামনে আনা এবং বিনোদনের মধ্য দিয়ে সমাজের প্রতি নিজের দায়বদ্ধতা পালন করা।
FAQ
১. হানিফ সংকেতের জন্মদিন কবে?
হানিফ সংকেতের জন্ম ১৯৫৮ সালের ২৩ অক্টোবর। ২০২৬ সালের ২৩ অক্টোবর তাঁর ৬৮তম জন্মদিন।
২. হানিফ সংকেতের জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’ কবে শুরু হয়?
১৯৮৯ সালের মার্চে বাংলাদেশ টেলিভিশনে ‘ইত্যাদি’র যাত্রা শুরু হয়।
৩. হানিফ সংকেত ২০২৬ সালে কোন পুরস্কার পেয়েছেন?
সংস্কৃতিতে অবদানের জন্য ২০২৬ সালে স্বাধীনতা পুরস্কার পেয়েছেন হানিফ সংকেত। এর আগে ২০১০ সালে তিনি একুশে পদক অর্জন করেন।
৪. হানিফ সংকেতের টেলিভিশনজীবনের শুরু কীভাবে?
বরেণ্য সাংবাদিক ও উপস্থাপক ফজলে লোহানীর ‘যদি কিছু মনে না করেন’ অনুষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে তাঁর টেলিভিশনজীবনের শুরু।
৫. হানিফ সংকেত জন্মদিন নিয়ে কী ভাবেন?
জন্মদিন এলে জীবন থেকে আরও একটি বছর চলে যাওয়ার কথা এবং অসমাপ্ত কাজের কথা মনে পড়ে বলে জানিয়েছেন তিনি। বড় আয়োজনের পরিবর্তে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটাতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন।
তানভির ইসলাম/
পাঠকের মতামত:
আপনার জন্য বাছাই করা কিছু নিউজ
- জমি রেজিস্ট্রির সময় কী কী দেখে স্বাক্ষর করবেন? জেনে নিন
- আজকের টাকার রেট কত:বেড়েছে২টি দেশের টাকার বিনিময় হার
- ওয়ারিশের জমি নামজারি ও আলাদা খতিয়ান করার নিয়ম
- OnePlus Turbo 7 Pro-তে ১৮৫Hz ডিসপ্লে, ১০,০০০mAh ব্যাটারি?
- জমির রেকর্ডে ভুল? সংশোধনের আবেদন করবেন যেখানে
- ড্রাইভিং লাইসেন্স নবায়নে কত টাকা লাগে, দেরি হলে কত জরিমানা
- শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ৩ দিনের ছুটি, তারিখ জেনে নিন