ঢাকা, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬, ৬ কার্তিক ১৪৩৩

অল্প হাঁটলেই দম ফুরোচ্ছে? কোন লক্ষণে দেরি না করে যাবেন ডাক্তারের কাছে

স্বাস্থ্য ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ অক্টোবর ২০ ১২:৫৩:০৪
অল্প হাঁটলেই দম ফুরোচ্ছে? কোন লক্ষণে দেরি না করে যাবেন ডাক্তারের কাছে

সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠতেই বুক ধড়ফড়, বাজারে হেঁটে যেতে গিয়ে মাঝপথে থেমে দম নিতে হচ্ছে, এমন অভিজ্ঞতা অনেকেরই আছে। কেউ ভাবেন বয়স বেড়েছে, কেউ ভাবেন শরীর ভারী হয়েছে বলেই এমন হচ্ছে। কিন্তু চিকিৎসকদের মতে, সামান্য পরিশ্রমে বারবার শ্বাসকষ্ট হওয়া শুধু অলসতা বা বয়সের ফল নয়। এর পেছনে হৃদ্‌যন্ত্র, ফুসফুস বা রক্তের সমস্যাও থাকতে পারে। কিছু উপসর্গ দেখা দিলে অপেক্ষা না করে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যাওয়া জরুরি।

আগে বুঝুন: কোন শ্বাসকষ্ট স্বাভাবিক, কোনটি নয়

দৌড়ানোর পর, ভারী বোঝা বইলে বা খাড়া পথ বেয়ে উঠলে সবারই শ্বাসের গতি বাড়ে। এটি শরীরের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া। চিকিৎসাবিজ্ঞানে যাকে ডিসপনিয়া বলা হয়, তা হলো এমন অবস্থা, যখন কাজের তুলনায় শ্বাস নিতে অস্বাভাবিক কষ্ট হয়। সতর্ক হওয়ার বিষয় হলো, যে কাজ আগে অনায়াসে করতে পারতেন, তা করতে গিয়ে এখন হাঁপিয়ে যাচ্ছেন কি না। অর্থাৎ নিজের স্বাভাবিক সক্ষমতার তুলনায় হঠাৎ বা ধীরে ধীরে অবনতি হলে সেটি অবহেলা করা ঠিক নয়।

সামান্য হাঁটলেই শ্বাসকষ্টের সম্ভাব্য কারণ

হৃদ্‌রোগ: হৃদ্‌যন্ত্র দুর্বল হয়ে পড়লে (হার্ট ফেইলিউর), হৃদ্‌যন্ত্রের রক্তনালিতে ব্লক থাকলে বা হৃদ্‌স্পন্দনের ছন্দে গোলমাল হলে পরিশ্রমে শ্বাসকষ্ট হতে পারে। সঙ্গে পায়ে পানি আসা, শুয়ে থাকলে কষ্ট বাড়া বা বুকে চাপ অনুভব হলে বিষয়টি আরও গুরুতর হওয়ার ইঙ্গিত দিতে পারে।

ফুসফুসের সমস্যা: হাঁপানি, দীর্ঘমেয়াদি ফুসফুসের প্রদাহজনিত রোগ (সিওপিডি), ফুসফুসে সংক্রমণ, যক্ষ্মা বা ফুসফুসের টিস্যুর রোগে শ্বাসকষ্ট দেখা দিতে পারে। ধূমপায়ী, দীর্ঘদিন ধুলাবালি বা ধোঁয়ার সংস্পর্শে থাকা মানুষ এবং রান্নায় কাঠ-খড়ির চুলার ধোঁয়ায় অভ্যস্তদের ঝুঁকি বেশি।

রক্তস্বল্পতা: রক্তে হিমোগ্লোবিন কমে গেলে শরীরের কোষে অক্সিজেন সরবরাহ কমে যায়। ফলে অল্প পরিশ্রমেই হাঁপিয়ে যাওয়া, ফ্যাকাশে ভাব ও দুর্বলতা দেখা দিতে পারে।

ওজনাধিক্য ও শারীরিক অসক্রিয়তা: দীর্ঘদিন কম নড়াচড়া ও অতিরিক্ত ওজন হৃদ্‌যন্ত্র ও ফুসফুসের ওপর বাড়তি চাপ ফেলে।

থাইরয়েডের সমস্যা: থাইরয়েড হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হলে হৃদ্‌স্পন্দন ও শক্তির মাত্রায় প্রভাব পড়ে, যা শ্বাসকষ্ট বা ক্লান্তির কারণ হতে পারে।

আরও পড়ুন:

সারাক্ষণ ক্লান্ত লাগে? নারীদের শরীরে লুকিয়ে থাকতে পারে এই ঘাটতি

অনেক খেয়েও ওজন বাড়ে না? কারণ হতে পারে এগুলো

উদ্বেগ ও মানসিক চাপ: তীব্র দুশ্চিন্তা বা প্যানিক অ্যাটাকের সময়ও বুক ধড়ফড় ও শ্বাস নিতে কষ্টের অনুভূতি হতে পারে। তবে অন্য শারীরিক কারণ বাদ দেওয়ার পরই কেবল এ সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত।

যেসব লক্ষণ দেখা দিলে এখনই জরুরি চিকিৎসা নিন

শ্বাসকষ্টের সঙ্গে নিচের যেকোনো উপসর্গ থাকলে দেরি না করে নিকটস্থ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে যাওয়া বা অ্যাম্বুলেন্স ডাকা উচিত:

বুকে চাপ, ব্যথা বা জ্বালাভাব, যা হাত, কাঁধ, চোয়াল বা পিঠে ছড়িয়ে পড়ছে

হঠাৎ তীব্র শ্বাসকষ্ট শুরু হওয়া

অজ্ঞান হয়ে যাওয়া বা প্রায় অজ্ঞান হওয়ার মতো অনুভূতি

ঠোঁট, মুখ বা নখ নীলচে হয়ে যাওয়া

কথা বলতে গিয়ে বাক্য শেষ করতে না পারা

কাশির সঙ্গে রক্ত পড়া

এক পায়ে হঠাৎ ফোলা ও ব্যথার সঙ্গে শ্বাসকষ্ট

অতিরিক্ত ঘাম ও বমি বমি ভাবের সঙ্গে বুকের অস্বস্তি

কখন নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন

জরুরি লক্ষণ না থাকলেও নিচের পরিস্থিতিতে দ্রুত সময় করে চিকিৎসকের কাছে যাওয়া উচিত:

কয়েক সপ্তাহ ধরে সামান্য পরিশ্রমে হাঁপিয়ে যাচ্ছেন

আগের তুলনায় হাঁটার সক্ষমতা কমে গেছে

শুয়ে থাকলে শ্বাসকষ্ট বাড়ছে, বালিশ উঁচু করে ঘুমাতে হচ্ছে

রাতে শ্বাসকষ্টের কারণে ঘুম ভেঙে যাচ্ছে

দীর্ঘদিন ধরে কাশি, বুকে ঘড়ঘড় শব্দ বা কফ আছে

পা, গোড়ালি বা পেট ফুলে যাচ্ছে

অকারণে ওজন কমছে বা ক্লান্তি বাড়ছে

চিকিৎসক কী কী পরীক্ষা দিতে পারেন

কারণ নির্ণয়ে চিকিৎসক সাধারণত রোগীর ইতিহাস শুনে শারীরিক পরীক্ষা করেন। প্রয়োজনে দেওয়া হতে পারে:

রক্ত পরীক্ষা (সিবিসি, থাইরয়েড ফাংশন ইত্যাদি)

ইসিজি ও ইকোকার্ডিওগ্রাম

বুকের এক্স-রে

স্পাইরোমেট্রি বা ফুসফুসের কার্যক্ষমতা পরীক্ষা

রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা পরিমাপ

কোন পরীক্ষা প্রয়োজন, তা রোগীর উপসর্গ ও ঝুঁকির ওপর নির্ভর করে।

ঝুঁকি কমাতে যা করতে পারেন

ধূমপান ও তামাক সম্পূর্ণ ত্যাগ করুন এবং পরোক্ষ ধূমপান এড়িয়ে চলুন

ধুলাবালি ও দূষিত পরিবেশে মাস্ক ব্যবহার করুন

ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন

চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ধীরে ধীরে নিয়মিত হাঁটা বা হালকা ব্যায়াম শুরু করুন

উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও কোলেস্টেরলের নিয়মিত পরীক্ষা ও চিকিৎসা চালিয়ে যান

হাঁপানি বা সিওপিডির রোগীরা চিকিৎসকের দেওয়া ইনহেলার ও ওষুধ নিয়মিত ব্যবহার করুন

(বি.দ্র.: এই প্রতিবেদন সাধারণ স্বাস্থ্যসচেতনতার উদ্দেশ্যে লেখা। এটি চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়। শ্বাসকষ্টে জরুরি অবস্থা মনে হলে দেরি না করে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হোন।)

প্রাসঙ্গিক FAQ

প্রশ্ন ১: সামান্য হাঁটলেই শ্বাসকষ্ট হলে কি হার্টের সমস্যা হতে পারে?

উত্তর: হ্যাঁ, হতে পারে। হৃদ্‌যন্ত্র দুর্বল হলে বা রক্তনালিতে ব্লক থাকলে পরিশ্রমে শ্বাসকষ্ট দেখা দিতে পারে। তবে ফুসফুস, রক্তস্বল্পতা বা থাইরয়েডের সমস্যাতেও এটি হয়। তাই পরীক্ষা ছাড়া কারণ নিশ্চিত করা যায় না।

প্রশ্ন ২: কোন ধরনের শ্বাসকষ্টে জরুরি বিভাগে যেতে হবে?

উত্তর: বুকে ব্যথা বা চাপের সঙ্গে শ্বাসকষ্ট, হঠাৎ তীব্র কষ্ট, অজ্ঞান হওয়া, ঠোঁট নীলচে হয়ে যাওয়া, কথা বলতে না পারা বা কাশিতে রক্ত পড়লে অবিলম্বে জরুরি চিকিৎসা নিতে হবে।

প্রশ্ন ৩: রক্তস্বল্পতা থাকলে কি হাঁটতে গিয়ে শ্বাসকষ্ট হয়?

উত্তর: হ্যাঁ। হিমোগ্লোবিন কম থাকলে শরীরের কোষে পর্যাপ্ত অক্সিজেন পৌঁছায় না। তাই অল্প পরিশ্রমেই হাঁপিয়ে যাওয়া, দুর্বলতা ও ফ্যাকাশে ভাব দেখা দিতে পারে।

প্রশ্ন ৪: ওজন বেশি হলে কি পরিশ্রমে শ্বাসকষ্ট বাড়ে?

উত্তর: অতিরিক্ত ওজন হৃদ্‌যন্ত্র ও ফুসফুসের ওপর বাড়তি চাপ ফেলে, ফলে সামান্য পরিশ্রমেও শ্বাসকষ্ট হতে পারে। তবে শ্বাসকষ্টকে শুধু ওজনের দোষ ভেবে এড়িয়ে না গিয়ে কারণ যাচাই করা জরুরি।

প্রশ্ন ৫: শ্বাসকষ্ট হলে নিজে নিজে ইনহেলার বা ওষুধ নেওয়া যাবে কি?

উত্তর: চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ওষুধ নেওয়া ঠিক নয়। আগে থেকে হাঁপানি বা সিওপিডি ধরা পড়ে থাকলে চিকিৎসকের দেওয়া নির্দেশনা মেনে ইনহেলার ব্যবহার করতে হবে। নতুন উপসর্গে আগে পরীক্ষা করানো উচিত।

তানভির ইসলাম/

পাঠকের মতামত: