ঢাকা, বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬, ৬ কার্তিক ১৪৩৩

সারাক্ষণ ক্লান্ত লাগে? নারীদের শরীরে লুকিয়ে থাকতে পারে এই ঘাটতি

স্বাস্থ্য ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ অক্টোবর ২০ ১২:৩৪:৩৭
সারাক্ষণ ক্লান্ত লাগে? নারীদের শরীরে লুকিয়ে থাকতে পারে এই ঘাটতি

ঘুম হয়েছে, তবু সকালে উঠে শরীর ভারী। দুপুর গড়াতেই চোখ জুড়ে আসে, কাজে মন বসে না। অনেক নারীই এমন ক্লান্তিকে "সংসারের চাপ" বা "বয়সের দোষ" বলে এড়িয়ে যান। কিন্তু চিকিৎসকেরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে এমন অবসাদ চলতে থাকলে এর পেছনে থাকতে পারে শরীরের প্রয়োজনীয় কিছু পুষ্টি উপাদানের ঘাটতি। আর নারীদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।

কেন নারীরা বেশি ঝুঁকিতে

প্রতি মাসের ঋতুস্রাবে রক্তক্ষরণ, গর্ভাবস্থা ও স্তন্যদানকালে বাড়তি পুষ্টির চাহিদা, আবার অনেক সময় নিজের খাওয়াদাওয়ার দিকে নজর না দেওয়া, এসব মিলিয়ে নারীদের শরীরে নানা পুষ্টির ভারসাম্য সহজেই নড়ে যায়। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ায় প্রজননক্ষম বয়সী নারীদের মধ্যে রক্তস্বল্পতা বহুল প্রচলিত একটি স্বাস্থ্যসমস্যা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও (ডব্লিউএইচও) বৈশ্বিকভাবে নারীদের রক্তস্বল্পতাকে গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেছে।

১. আয়রন: ক্লান্তির সবচেয়ে পরিচিত কারণ

শরীরের প্রতিটি কোষে অক্সিজেন পৌঁছে দেয় রক্তের হিমোগ্লোবিন, আর হিমোগ্লোবিন তৈরিতে অপরিহার্য আয়রন। এর ঘাটতি হলে রক্তে অক্সিজেন সরবরাহ কমে যায়, ফলে শরীর দ্রুত অবসন্ন হয়ে পড়ে।

ঘাটতির সম্ভাব্য লক্ষণ:

অল্প পরিশ্রমেই হাঁপিয়ে যাওয়া

ত্বক ও চোখের নিচের অংশ ফ্যাকাশে দেখানো

মাথা ঘোরা ও মাথাব্যথা

হাত-পা ঠান্ডা থাকা

চুল পড়া, নখ ভঙ্গুর হয়ে যাওয়া

যেসব খাবারে মেলে: লাল মাংস, কলিজা, মাছ, ডিম, ডাল, পালংশাক ও অন্যান্য গাঢ় সবুজ শাক, কাজুবাদাম ও কিশমিশ। উদ্ভিজ্জ উৎসের আয়রন শরীরে ভালোভাবে শোষিত হয় ভিটামিন সি-এর সঙ্গে খেলে, তাই খাবারের সঙ্গে লেবু বা আমলকীর মতো টক ফল রাখা উপকারী। অন্যদিকে খাবারের ঠিক পরপরই চা বা কফি পান করলে আয়রনের শোষণ কমে যেতে পারে।

২. ভিটামিন বি১২: স্নায়ু ও রক্তকোষের রক্ষক

ভিটামিন বি১২ লোহিত রক্তকণিকা তৈরি ও স্নায়ুতন্ত্রের সুস্থতায় ভূমিকা রাখে। এর ঘাটতি হলে ক্লান্তির পাশাপাশি দেখা দিতে পারে হাত-পায়ে ঝিনঝিন ভাব, স্মৃতিশক্তি দুর্বল হওয়া ও মনোযোগের সমস্যা।

এই ভিটামিন প্রধানত মেলে প্রাণিজ খাবারে: মাছ, মাংস, ডিম ও দুগ্ধজাত খাবারে। তাই নিরামিষভোজী নারীদের ঘাটতির ঝুঁকি বেশি। এ ছাড়া দীর্ঘদিন কিছু নির্দিষ্ট ওষুধ সেবন করলে বা পরিপাকতন্ত্রের কিছু সমস্যা থাকলেও বি১২ শোষণে বাধা আসতে পারে।

৩. ফোলেট বা ভিটামিন বি৯

নতুন কোষ তৈরি ও রক্ত উৎপাদনে ফোলেট জরুরি। ঘাটতি হলেও রক্তস্বল্পতা ও ক্লান্তি দেখা দিতে পারে। গর্ভধারণের পরিকল্পনা করছেন বা গর্ভবতী, এমন নারীদের জন্য এটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ, কারণ গর্ভের শিশুর স্নায়ুতন্ত্রের বিকাশে ফোলেটের ভূমিকা রয়েছে। ডাল, শিম, পালংশাক, ব্রকলি ও সাইট্রাস ফলে ফোলেট পাওয়া যায়।

৪. ভিটামিন ডি

রোদের দেশ হলেও আমাদের অঞ্চলে ভিটামিন ডি-র ঘাটতি অস্বাভাবিক নয়। ঘরের ভেতরে বেশি সময় কাটানো, শরীর ঢেকে রাখা পোশাক বা রোদ এড়িয়ে চলার অভ্যাস এর অন্যতম কারণ। ঘাটতিতে ক্লান্তির সঙ্গে হাড় ও মাংসপেশিতে ব্যথা, দুর্বলতা দেখা দিতে পারে। সকালের মৃদু রোদ ছাড়াও ডিমের কুসুম ও চর্বিযুক্ত মাছ এই ভিটামিনের উৎস। তবে ঘাটতি ধরা পড়লে সাপ্লিমেন্ট লাগবে কি না ও কত মাত্রায়, তা চিকিৎসকের পরামর্শেই ঠিক করা উচিত।

৫. ম্যাগনেসিয়াম ও আয়োডিন

ম্যাগনেসিয়াম শরীরের শক্তি উৎপাদনপ্রক্রিয়া ও পেশির কাজে সহায়তা করে। বাদাম, বীজ, গোটা শস্য ও সবুজ শাকসবজিতে এটি থাকে। আয়োডিন থাইরয়েড হরমোনের জন্য প্রয়োজনীয়, আর থাইরয়েডের কার্যক্ষমতা কমে গেলে ক্লান্তি, ওজন বাড়া ও শীতভাব অনুভূত হতে পারে। আয়োডিনযুক্ত লবণ ও সামুদ্রিক খাবার এর উৎস।

শুধু পুষ্টির ঘাটতিই নয়

ক্লান্তির কারণ সবসময় খাবারে সীমাবদ্ধ নয়। থাইরয়েডের সমস্যা, ডায়াবেটিস, অপর্যাপ্ত বা অনিয়মিত ঘুম, দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ, বিষণ্নতা ও কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও এর পেছনে থাকতে পারে। তাই নিজে নিজে সিদ্ধান্ত নিয়ে আয়রন বা ভিটামিনের ওষুধ শুরু করা ঠিক নয়। অতিরিক্ত আয়রন বা কিছু ভিটামিন শরীরের ক্ষতিও করতে পারে।

কখন চিকিৎসকের কাছে যাবেন

ক্লান্তি কয়েক সপ্তাহ ধরে চলতে থাকলে

বিশ্রাম নিলেও অবসাদ না কমলে

ঋতুস্রাবে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ হলে

শ্বাসকষ্ট, বুক ধড়ফড় বা মাথা ঘোরার মতো উপসর্গ থাকলে

সাধারণত রক্তের সিবিসি, ফেরিটিন, ভিটামিন বি১২, ভিটামিন ডি ও থাইরয়েড পরীক্ষার মাধ্যমে কারণ শনাক্ত করা যায়।

প্রতিদিনের খাবারে যা করতে পারেন

প্রতি বেলায় প্রোটিনের উৎস রাখুন: মাছ, ডিম, ডাল বা মাংস

রোজ অন্তত একবার গাঢ় সবুজ শাকসবজি খান

মৌসুমি ফল ও বাদাম নাশতায় রাখুন

দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকা বা ডায়েটের নামে খাবার বাদ দেওয়া এড়িয়ে চলুন

নিয়মিত হালকা ব্যায়াম ও পর্যাপ্ত ঘুমের অভ্যাস গড়ুন

(বি.দ্র.: এ প্রতিবেদন সাধারণ স্বাস্থ্যসচেতনতার উদ্দেশ্যে লেখা। এটি চিকিৎসকের পরামর্শের বিকল্প নয়।)

প্রাসঙ্গিক FAQ

প্রশ্ন ১: সবসময় ক্লান্ত লাগলে কি সব ক্ষেত্রেই পুষ্টির ঘাটতি দায়ী?

উত্তর: না। পুষ্টির ঘাটতি একটি সম্ভাব্য কারণ মাত্র। থাইরয়েডের সমস্যা, ডায়াবেটিস, ঘুমের অভাব, মানসিক চাপ বা বিষণ্নতার কারণেও ক্লান্তি হতে পারে। সঠিক কারণ জানতে চিকিৎসকের পরামর্শ ও পরীক্ষা প্রয়োজন।

প্রশ্ন ২: নারীদের আয়রনের ঘাটতি বেশি হয় কেন?

উত্তর: ঋতুস্রাবে নিয়মিত রক্তক্ষরণ এবং গর্ভাবস্থা ও স্তন্যদানকালে বাড়তি চাহিদার কারণে নারীদের আয়রনের প্রয়োজন পুরুষের তুলনায় বেশি।

প্রশ্ন ৩: নিরামিষভোজীদের কোন ভিটামিনের ঘাটতির ঝুঁকি বেশি?

উত্তর: ভিটামিন বি১২ প্রধানত প্রাণিজ খাবারে পাওয়া যায়, তাই নিরামিষভোজীদের এর ঘাটতির ঝুঁকি বেশি। প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শে পরীক্ষা করিয়ে সাপ্লিমেন্ট নেওয়া যেতে পারে।

প্রশ্ন ৪: চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া আয়রন ট্যাবলেট খাওয়া কি নিরাপদ?

উত্তর: না। প্রয়োজনের অতিরিক্ত আয়রন শরীরের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। রক্ত পরীক্ষার পর চিকিৎসক মাত্রা ঠিক করে দিলে সেটাই অনুসরণ করা উচিত।

প্রশ্ন ৫: খাবারের মাধ্যমে আয়রনের শোষণ কীভাবে বাড়ানো যায়?

উত্তর: আয়রনসমৃদ্ধ খাবারের সঙ্গে লেবু, আমলকী বা অন্য টক ফলের মতো ভিটামিন সি-যুক্ত খাবার খেলে শোষণ বাড়ে। খাবারের পরপরই চা-কফি এড়িয়ে চলা ভালো।

তানভির ইসলাম/

পাঠকের মতামত: