ঢাকা, শনিবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১২ ফাল্গুন ১৪৩০

এ যেন ভাঙা ঘরে চাঁদের আলো, মাত্র ১৪ বছরেই দেশসেরা বীথি!

খেলা ডেস্ক . ২৪আপডেট নিউজ
২০২৪ ফেব্রুয়ারি ১০ ১৭:১৫:২৯
এ যেন ভাঙা ঘরে চাঁদের আলো, মাত্র ১৪ বছরেই দেশসেরা বীথি!

নাম মোর্শেদা খাতুন বীথি! মাত্র ১৪ বছর বয়স তার। এই অল্প বয়সেই বাংলাদেশের সেরা অনূর্ধ্ব-১৫ বালিকা ভলিবল খেলোয়াড় হয়েছেন বীথি খাতুন। তবে দেশ সেরা হওয়া তার জন্য একটুও সহজ ছিল না। দরিদ্র পরিবারের সন্তান হওয়ায় তাকে অনেক বাধা অতিক্রম করতে হয়েছে। প্রতিবেশীদের কাছ থেকে সব বাধা ও কড়া কথা কাটিয়ে বীথি এখন সবার অহংকার ও গৌরব। মাত্র দুই বছরে মা-বাবার ভাঙা ঘরে চাঁদের আলো হয়ে উঠেছে বিথি।

বীথি পাবনা সদরের রাধানগর বাগানপাড়া মহল্লার আজিজুর রহমান ও বুলবুলি খাতুনের একমাত্র মেয়ে । আজিজুর রহমান নৈশ প্রহরীর কাজ করে সংসার চালান। বীথি আদর্শ গার্লস হাই স্কুলের অষ্টম শ্রেণীর ছাত্রী।

জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে ঢাকায় বাংলাদেশ মহিলা ক্রীড়া ফেডারেশন আয়োজিত আন্তঃবিভাগীয় অনূর্ধ্ব-১৫ বালিকা ভলিবল প্রতিযোগিতায় পাবনা জেলা চ্যাম্পিয়ন হয়। এবং দেশের সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হন বীথি।

বৃহস্পতিবার (৮ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে বীথিদের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, একটা লম্বা জরাজীর্ণ পুরনো বাড়ি আর একটা ভাঙা টিনের ঘর। ক্ষুদ্র জমির মালিকদের আবাসন। এই ভাঙা বাড়ি থেকেই উঠে আসেছে দেশের সেরা ভলিবল খেলোয়াড়।

কথোপকথনের সময় বীথি মা বুলবুলি খাতুন বলেন, “তাদের একের পর এক দুই ছেলের জন্ম হলেও অল্প বয়সেই তারা মারা যায়। এরপর একমাত্র কন্যা বিথী গর্ভে আসে। ছোটবেলা থেকেই খেলাধুলার জন্য প্রবল আগ্রহ ছিলো বীথির। কিন্তু দারিদ্র্যের কারণে লেখাপড়ার বোঝা ছিল যেখানে খেলোয়াড় হওয়ার স্বপ্ন ছিল।

তিনি বলেন, ‘মেয়ে হয়ে এই খেলার জন্য প্রতিবেশীরা অনেক কথা শুনিয়েছে। খুবই কষ্ট পেতাম। মেয়েটা মন মরা হয়ে বসে থাকতো। কিন্তু আমরা দমে যাইনি। মেয়েকে সাহস দিয়েছি। আজ আমাদের মেয়ে এত বড় সাফল্য অর্জন করেছে ভাবতেই পারছি না।’

বীথির বাবা আজিজুর রহমান জানান, ‘ছোটবেলা থেকেই ওকে খুব কষ্ট করে মানুষ করে চলেছি। নাইটগার্ডের সামান্য বেতনে সংসার চালাবো নাকি মেয়েকে লেখাপড়া ও খেলাধুলা শেখাবো এ নিয়ে খুব দুশ্চিন্তায় থাকতে হয়। প্রথমদিকে আমি ওকে খেলাধুলায় নিষেধ করেছিলাম। কিন্তু মেয়েটা শোনেনি। পরে দেখলাম যে মেয়েটা খেলতে ভালোবাসে। তখন আর তাকে থামাইনি। উৎসাহ দিয়েছি। আশা করি ভবিষ্যতে আমার মেয়ে দেশের মুখ উজ্জল করবে।’

বীথি বলেন, ‘তিন বছর আগে থেকে আমি অ্যাথলেটিকস খেলা শুরু করি। তখন পাবনা জেলার হয়ে রাজশাহীতে গিয়ে অ্যাথলেটিকসে নৈপুণ্য দেখাই। আমাকে নজরে পড়ে মহিলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক হোসনে আরা খাতুন হাওয়ার। সেখান থেকে দু’বছর আগে আমাকে যুক্ত করা হয় পাবনা জেলা মহিলা ভলিবল দলে।’

ভবিষ্যত পরিকল্পনা ও স্বপ্ন সম্পর্কে বীথি জানায়, ‘অনেকে খারাপ কথা বলেছে আমার খেলা নিয়ে। কিন্তু এখন সবাই খুশি। আমি কখনো ভাবতে পারিনি, এত কম সময়ে দেশসেরা খেলোয়াড় হবো। এখন আমার স্বপ্ন বাবা-মায়ের তো ছেলে নেই। আমি মেয়ে হয়ে তাদের সেই স্বপ্ন পূরণ করতে চাই। একটা সরকারি চাকুরী করে বাবা-মায়ের পাশে দাঁড়াতে চাই, তাদের দুঃখ দূর করতে চাই। আমার দেশের হয়ে খেলে যেতে চাই।’

পাবনা জেলা মহিলা ক্রীড়া সংস্থার সাধারণ সম্পাদক হোসেনে আরা খাতুন হাওয়া বলেন, ‘বীথির মধ্যে প্রতিভা আছে। তার শারীরিক গঠন, খেলার স্টাইল দেখে মনে হয়েছে সে ভলিবলে ভালো করবে। সেখান থেকেই তাকে অনূর্ধ্ব-১৫ পাবনা জেলা মহিলা ভলিবলে নিয়ে আসা। তাকে যেমন প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে সে ঠিক সেভাবেই ভালো করেছে। এখন আমাদের খুব গর্ব হচ্ছে। আশা করি আগামীতে বাংলাদেশের হয়ে দেশের জন্য সুনাম বয়ে আনবে বীথি।’

পাবনার জেলা প্রশাসক মুহাম্মদ আসাদুজ্জামান বলেন, ‘বীথি ও তার পরিবারের খবর জানার পর আমরা তাদের নগদ আর্থিক সহায়তা দিয়েছে। বিষয়টি প্রধানমন্ত্রীর নজরে আসার পর তার নির্দেশে আমরা ইতোমধ্যে বীথির বাড়ি পরিদর্শন করেছি। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে তাদের একটি বসবাসের মতো একটি বাড়ি করে দেয়া হবে। সেই সঙ্গে বীথির লেখাপড়ার সব খরচ জেলা প্রশাসন বহন করবে। তাদের যেকোনো প্রয়োজনে জেলা প্রশাসন তাদের পাশে থাকবে।’

আপনার জন্য বাছাই করা কিছু নিউজ



রে