ঢাকা, রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ৫ আশ্বিন ১৪৩৩

নতুন বন্যবিড়াল আবিষ্কার, বদলাতে পারে বিড়াল প্রজাতির হিসাব

বিশ্ব ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ সেপ্টেম্বর ২০ ১৯:২৫:১৭
নতুন বন্যবিড়াল আবিষ্কার, বদলাতে পারে বিড়াল প্রজাতির হিসাব

এতদিন পরিচিত বন্যবিড়ালদের ভিড়েই ছিল প্রাণীটি। দেখতে অন্য টাইগার ক্যাটের সঙ্গে এতটাই মিল যে আলাদা কোনো প্রজাতি হিসেবে তার অস্তিত্ব ধরা পড়েনি। শেষ পর্যন্ত একটি উদ্ধারকেন্দ্রে থাকা ১০ বছর বয়সী ‘টিগ্রিনো’কে ঘিরে গবেষণায় সেই ভুল ভাঙে। ডিএনএ বিশ্লেষণ নিশ্চিত করেছে, বলিভিয়ার বনাঞ্চলে পাওয়া এই ছোট ছোপযুক্ত বিড়াল আসলে সম্পূর্ণ আলাদা একটি প্রজাতি। এর নাম লেপার্ডাস তিলকায়ো (Leopardus tilcayo)।

১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ প্রকাশিত গবেষণাটিতে আরও উঠে এসেছে, এই আবিষ্কারের প্রভাব শুধু একটি নতুন প্রাণীর পরিচয় নির্ধারণেই সীমিত নয়। টাইগার ক্যাটের সংখ্যা নিয়েও নতুন হিসাব সামনে এসেছে। গবেষকদের বিশ্লেষণে ইঙ্গিত মিলেছে, পরিচিত তিনটির পরিবর্তে এদের প্রজাতি পাঁচটি হতে পারে।

একটি অস্বাভাবিক বিড়াল থেকেই সূত্রপাত

নতুন প্রজাতির সন্ধানের পেছনে রয়েছে বলিভিয়ার একটি উদ্ধারকেন্দ্রের প্রাণী। ১০ বছর বয়সী বিড়ালটির ডাকনাম ‘টিগ্রিনো’। স্থানীয় এক বাসিন্দা একসময় বন থেকে তাকে উদ্ধার করেছিলেন। প্রথম দিকে প্রাণীটিকে গৃহপালিত বিড়ালের বাচ্চা বলেই মনে করা হয়েছিল।

কিন্তু বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার আচরণে ভিন্নতা স্পষ্ট হয়। পরে বলিভিয়ার বিজ্ঞানী ড. পাওলা নোগালেস-আস্কারুনজ অভয়ারণ্যে স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করার সময় বিড়ালটিকে দেখে মনে করেন, প্রাণীটির মধ্যে কিছু অস্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে।

এর পাশাপাশি তিনি দেশের ইয়ুঙ্গাস অঞ্চলের ঘন বনাঞ্চলে একই ধরনের ছোট বন্যবিড়াল দেখা যাওয়ার খবরও শুনেছিলেন। কিন্তু এসব প্রাণীকে নিয়ে তখন পর্যন্ত বিজ্ঞানীদের কোনো অনুসন্ধান হয়নি।

নমুনা আর জিনগত তথ্য মিলিয়েই খুলল রহস্য

প্রাণীটির প্রকৃত পরিচয় জানতে ড. নোগালেস-আস্কারুনজ বিভিন্ন দেশের গবেষকদের সঙ্গে কাজ শুরু করেন। জীবিত প্রাণী এবং জাদুঘরে সংরক্ষিত নমুনা থেকে সংগৃহীত ডিএনএ ব্যবহার করে টাইগার ক্যাটদের পারিবারিক ইতিহাস পরীক্ষা করা হয়।

সেখানেই পাওয়া যায় গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য। গবেষণার ফল বলছে, ‘টিগ্রিনো’ কোনো পরিচিত টাইগার ক্যাট প্রজাতির সদস্য নয়; বরং এটি স্বতন্ত্র একটি শ্রেণির প্রাণী।

বলিভিয়ার লা পাজে অবস্থিত ইউনিভার্সিদাদ মেয়র দে সান আন্দ্রেসের গবেষক পাওলা নোগালেস-আস্কারুনজ এই আবিষ্কারকে বিশ্বের জন্য নতুন একটি প্রজাতি পাওয়ার চমৎকার ফলাফল হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তিনি আরও বলেন, নতুন প্রজাতি খুঁজে পেতে এবার কোনো আগ্নেয়গিরি, দ্বীপ কিংবা গভীর সমুদ্রেও যেতে হয়নি।

ব্রাজিলের পন্টিফিক্যাল ক্যাথলিক ইউনিভার্সিটি অব রিও গ্রান্ডে দো সুলের সংরক্ষণ জিনতত্ত্ববিদ এদুয়ার্দো এইজিরিকের ব্যাখ্যায়, প্রাণীটির ছবি ও রেকর্ড ছিল খুব কম। জাদুঘরেও এর কোনো নমুনা ছিল না। ফলে এটি অনেকটা অদৃশ্যই থেকে গিয়েছিল, কারণ কেউ তখন প্রাণীটিকে খুঁজছিল না।

টাইগার ক্যাটের পরিচিত তালিকায় বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত

কারেন্ট বায়োলজি সাময়িকীতে প্রকাশিত গবেষণায় টাইগার ক্যাটের শ্রেণিবিন্যাস নিয়েও নতুন তথ্য পাওয়া গেছে। গবেষকদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এতদিন তিনটি প্রজাতির কথা বলা হলেও প্রকৃত সংখ্যা পাঁচটি হতে পারে। নতুন শনাক্ত বলিভিয়ার টিলকায়া ক্যাটও সেই সম্ভাব্য তালিকায় রয়েছে।

দক্ষিণ ও মধ্য আমেরিকার বিভিন্ন এলাকায় টাইগার ক্যাট দেখা যায়। কোস্টা রিকা থেকে বলিভিয়া এবং আর্জেন্টিনা পর্যন্ত তাদের বিস্তৃতি রয়েছে। ছোট আকার ও ছোপযুক্ত শরীরের কারণে এদের দেখতে অনেকটা একই রকম।

এই সাদৃশ্যের কারণেই প্রজাতিগুলো আলাদা করে শনাক্ত করা বিশেষজ্ঞদের জন্যও কঠিন হয়ে পড়ে। উত্তরের টাইগার ক্যাট বা অনসিলা (Leopardus tigrinus)-এর চেহারার সঙ্গেও নতুন প্রজাতিটির মিল রয়েছে।

পরিচিত প্রজাতির তালিকাও বদলাতে পারে

সম্প্রতি পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে দুটি টাইগার ক্যাট প্রজাতি স্বীকৃত ছিল। এগুলো হলো উত্তরাঞ্চলীয় টাইগার ক্যাট বা অনসিলা (Leopardus tigrinus) এবং দক্ষিণাঞ্চলীয় টাইগার ক্যাট (Leopardus guttulus)। পরে ক্লাউডেড টাইগার ক্যাট (Leopardus pardinoides)-কে আলাদা প্রজাতির স্বীকৃতি দেওয়া হয়।

নতুন গবেষণার ফল বিড়াল পরিবারের সামগ্রিক হিসাবেও প্রভাব ফেলতে পারে। বন্য ও গৃহপালিত—সব বিড়ালই ফেলিডি (Felidae) পরিবারের অন্তর্ভুক্ত। বর্তমানে এই পরিবারের ৪১টি প্রজাতি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃত।

নতুন আবিষ্কার এবং টাইগার ক্যাটের আরও প্রজাতি থাকার সম্ভাবনা বিবেচনায় সেই সংখ্যা ৪৪ বা ৪৫ হতে পারে। জিনগত গবেষণা আরও এগোলে ভবিষ্যতে বিড়াল প্রজাতির সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলেও ধারণা করা হচ্ছে।

এর পেছনে ছোট বন্যবিড়াল নিয়ে অতীতে তুলনামূলক কম বৈজ্ঞানিক মনোযোগ পাওয়ার বিষয়টিও উঠে এসেছে।

নতুন পরিচয় এখন সংরক্ষণের পরবর্তী কাজের দরজা খুলছে

প্রজাতির পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গবেষণার শেষ নয়। এখন এই প্রাণী কোথায় কোথায় রয়েছে, কী পরিবেশে টিকে থাকে এবং বন্য অবস্থায় কোন ধরনের হুমকির মুখে পড়ে—এসব বিষয় জানার প্রয়োজন হবে।

যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়াইল্ডলাইফ কনজারভেশন রিসার্চ ইউনিটের সহগবেষক ড. ক্যারোলিন সার্টর বলেন, কোনো প্রজাতিকে রক্ষা করতে হলে আগে তার পরিচয় ও আবাসস্থল সম্পর্কে জানা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, গৃহপালিত বিড়ালের মতো আকারের প্রাণী হওয়ায় এগুলো সম্পর্কে সবকিছু জানা আছে বলে মনে হতে পারে। কিন্তু নতুন এই আবিষ্কার বিশ্বের কিছু অঞ্চলে জীববৈচিত্র্য সম্পর্কে এখনও কত কিছু অজানা, সেটিই দেখিয়ে দিয়েছে।

বন উজাড়, আবাসস্থল ধ্বংস এবং অবৈধ শিকারের কারণে টাইগার ক্যাট প্রজাতিগুলোকে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে থাকা বলে বিবেচনা করা হয়। প্রতিটি প্রজাতি সম্পর্কে তথ্য বাড়লে প্রাণী এবং তাদের আবাসস্থল রক্ষায় সংরক্ষণ পরিকল্পনা তৈরি করা সম্ভব হবে।

জিনোম গবেষণা ও জাদুঘরের সংগ্রহ গুরুত্বপূর্ণ

গবেষণাটির সঙ্গে যুক্ত না থাকা স্কটল্যান্ডের ন্যাশনাল মিউজিয়ামসের স্তন্যপায়ী প্রাণী বিশেষজ্ঞ অ্যান্ড্রু কিচেনার বলেন, দক্ষিণ আমেরিকার ছোট দাগযুক্ত বিড়ালগুলোকে দীর্ঘদিন ধরে ‘শ্রেণিবিন্যাসগত দুঃস্বপ্ন’ হিসেবে দেখা হয়েছে।

তাঁর মতে, প্রাণীগুলোর মধ্যে চেহারাগত মিল রয়েছে এবং জাদুঘরে নমুনাও খুব কম। ফলে জিনগত গবেষণার মাধ্যমে নতুন প্রজাতি শনাক্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের কীভাবে পৃথক করা যায়, সে বিষয়েও জ্ঞান বাড়ছে।

তিনি আরও বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পূর্ণ জিনোম সিকোয়েন্সিং প্রযুক্তির উন্নতি এবং নির্দিষ্ট স্থান থেকে আরও বেশি বন্য নমুনা সংগ্রহের ফলে এই শ্রেণিবিন্যাসগত জট খুলতে শুরু করেছে। তাঁর মতে, এটি কয়েকটি ধাপের মধ্যে সর্বশেষ ধাপ এবং সামনে আরও বিস্ময় থাকতে পারে।

বেলজিয়ামের অ্যান্টওয়ার্প বিশ্ববিদ্যালয়ের জোনাস লেস্ক্রোয়ারও জাদুঘরের সংগ্রহশালার গুরুত্বের কথা তুলে ধরেছেন। তাঁর বক্তব্য, এসব সংরক্ষিত নমুনা না থাকলে বলিভিয়া থেকে পাওয়া তথ্যের সঠিক ব্যাখ্যার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্য হয়তো পাওয়া যেত না।

প্রাকৃতিক ইতিহাসভিত্তিক এসব সংগ্রহ স্থায়ীভাবে সংরক্ষিত থাকার কারণেই নতুন গবেষণায় সেগুলো ব্যবহার করা সম্ভব হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেছেন।

আল-মামুন/

পাঠকের মতামত:

আপনার জন্য বাছাই করা কিছু নিউজ