ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২ আশ্বিন ১৪৩৩

Md Razib Ali

Senior Reporter

কালোজিরা ও মধুর উপকারিতা: কারা খাবেন, কারা খাবেন না

লাইফ স্টাইল ডেস্ক . ২৪আপডেটনিউজ
২০২৬ সেপ্টেম্বর ১৭ ১৬:৫৩:০৩
কালোজিরা ও মধুর উপকারিতা: কারা খাবেন, কারা খাবেন না

কালোজিরা ও মধু—দুটিই দীর্ঘদিন ধরে ঘরোয়া ও প্রচলিত খাদ্যাভ্যাসে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। অনেকেই মনে করেন, এই দুটি উপাদান একসঙ্গে খেলে শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে, হজমশক্তি ভালো হয়, দুর্বলতা কমে এবং যৌনক্ষমতাও বাড়তে পারে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন অনলাইন আলোচনায় কালোজিরা-মধুকে অনেক সময় ‘প্রাকৃতিক শক্তিবর্ধক’ হিসেবেও তুলে ধরা হয়।

কিন্তু বৈজ্ঞানিক গবেষণা কী বলছে? কালোজিরা ও মধু একসঙ্গে খেলে সত্যিই কি বিশেষ কোনো উপকার পাওয়া যায়? কারা এটি খেতে পারেন, কারা সতর্ক থাকবেন এবং এটি কি যৌনশক্তি বাড়ায়?

এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে কালোজিরা বা Nigella sativa এবং মধু নিয়ে প্রকাশিত গবেষণার তথ্য দেখা প্রয়োজন।

কালোজিরা ও মধু একসঙ্গে খেলে কী হতে পারে?

কালোজিরায় থাইমোকুইনোনসহ বেশ কিছু সক্রিয় উপাদান রয়েছে। বিভিন্ন গবেষণায় কালোজিরার প্রদাহ, অক্সিডেটিভ স্ট্রেস, রক্তে শর্করা ও কিছু বিপাকীয় সূচকের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে পরীক্ষা করা হয়েছে। তবে গবেষণাগুলোর মান ও ফলাফল এক নয়। ২০২৩ সালের একটি গবেষণা-পর্যালোচনায় কালোজিরা নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন মেটা-অ্যানালাইসিস মূল্যায়ন করে দেখা যায়, অনেক ফল আশাব্যঞ্জক হলেও অধিকাংশ গবেষণার প্রমাণের মান ছিল কম বা খুব কম। তাই কালোজিরাকে কোনো রোগের নিশ্চিত চিকিৎসা হিসেবে বিবেচনা করা যায় না।

মধু মূলত চিনি হলেও এতে বিভিন্ন জৈব সক্রিয় উপাদান রয়েছে। গবেষণায় মধুর প্রদাহ কমানো ও কিছু জীবাণুর বিরুদ্ধে কার্যকারিতার সম্ভাবনা নিয়ে তথ্য পাওয়া গেছে। তবে মধুকে নিয়মিত ওষুধের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার করার মতো প্রমাণ নেই।

অর্থাৎ, কালোজিরা ও মধু একসঙ্গে খেলে শরীরের জন্য কিছু সম্ভাব্য উপকারী পুষ্টি ও উদ্ভিজ্জ উপাদান পাওয়া যেতে পারে, কিন্তু এই মিশ্রণকে কোনো রোগের চিকিৎসা বা ‘সব রোগের ওষুধ’ বলা বৈজ্ঞানিকভাবে ঠিক নয়।

হজমের ক্ষেত্রে কি উপকার হতে পারে?

কালোজিরা ও মধুর সংমিশ্রণ নিয়ে সরাসরি মানুষের ওপর গবেষণা খুব বেশি নয়। তবে একটি র‍্যান্ডমাইজড, ডাবল-ব্লাইন্ড ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে কালোজিরার তেল ও মধুভিত্তিক একটি ফর্মুলেশন কার্যকরী বদহজমে আক্রান্ত ৭০ জন রোগীর ওপর পরীক্ষা করা হয়েছিল।

৮ সপ্তাহের গবেষণায় ওই ফর্মুলেশন গ্রহণকারী দলের বদহজমের উপসর্গে উন্নতি দেখা যায় এবং গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে গবেষণাটি ছোট এবং নির্দিষ্ট রোগীদের ওপর করা হয়েছিল। তাই সাধারণ সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে কালোজিরা-মধু একই ধরনের ফল দেবে—এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না।

রক্তে শর্করার ওপর কালোজিরার প্রভাব

কালোজিরা নিয়ে রক্তে শর্করার ওপর বেশ কিছু গবেষণা হয়েছে। ২০২৪ সালের একটি আপডেটেড মেটা-অ্যানালাইসিসে ৩০টি গবেষণা পর্যালোচনা করে দেখা যায়, কালোজিরা গ্রহণের সঙ্গে ফাস্টিং ব্লাড সুগার ও HbA1c কমার সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে গবেষণাগুলোর মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য ছিল এবং গবেষকরা আরও দীর্ঘমেয়াদি ও শক্তিশালী গবেষণার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—কালোজিরা রক্তে শর্করা কমাতে পারে বলে ডায়াবেটিসের ওষুধ বন্ধ করা যাবে না।

অন্যদিকে মধুতে যথেষ্ট পরিমাণ চিনি ও কার্বোহাইড্রেট রয়েছে। Mayo Clinic-এর তথ্য অনুযায়ী, ডায়াবেটিসে চিনি বাদ দিয়ে মধু ব্যবহার করলেই বিশেষ সুবিধা পাওয়া যায় না; মধুও রক্তে শর্করা বাড়ায় এবং পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি।

কালোজিরা কি শরীরের প্রদাহ ও অক্সিডেটিভ স্ট্রেস কমাতে পারে?

কালোজিরার অন্যতম আলোচিত উপাদান থাইমোকুইনোন। বিভিন্ন গবেষণায় এর অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও প্রদাহ-সংশ্লিষ্ট সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে পরীক্ষা করা হয়েছে।

একটি মেটা-অ্যানালাইসিসে কালোজিরা গ্রহণের সঙ্গে কিছু প্রদাহ ও অক্সিডেটিভ স্ট্রেসের সূচকে উন্নতির সম্পর্ক পাওয়া যায়। তবে গবেষণাগুলোর মধ্যে যথেষ্ট ভিন্নতা ছিল। ফলে এসব ফলাফলকে সম্ভাব্য উপকার হিসেবে দেখা যায়, নিশ্চিত চিকিৎসা হিসেবে নয়।

কালোজিরা ও মধু কি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায়?

কালোজিরা নিয়ে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা ও প্রদাহের ওপর বিভিন্ন গবেষণা রয়েছে। একইভাবে মধুতেও বিভিন্ন জৈব সক্রিয় উপাদান রয়েছে। তবে ‘কালোজিরা ও মধু খেলেই রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা অনেক বেড়ে যায়’—এমন সরাসরি ও শক্তিশালী মানব-গবেষণার প্রমাণ নেই।

তাই এটিকে সুষম খাবারের অংশ হিসেবে দেখা যেতে পারে, কিন্তু রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য একমাত্র উপায় হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।

কালোজিরা-মধু কি যৌনশক্তি বাড়ায়?

এটি সবচেয়ে বেশি প্রচলিত দাবিগুলোর একটি। তবে এখানে যৌনশক্তি বলতে কী বোঝানো হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ—যৌন ইচ্ছা, উত্থানক্ষমতা, বীর্যের মান এবং প্রজননক্ষমতা এক বিষয় নয়।

কালোজিরা নিয়ে পুরুষের প্রজননস্বাস্থ্যের ওপর কিছু গবেষণা হয়েছে। একটি ছোট র‍্যান্ডমাইজড ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে অস্বাভাবিক বীর্যমানের সমস্যায় থাকা পুরুষদের ৫ মিলিলিটার কালোজিরার তেল প্রতিদিন দুই মাস দেওয়া হয়েছিল। গবেষণায় বীর্যের সংখ্যা, গতিশীলতা, আকৃতি ও বীর্যের পরিমাণের কিছু সূচকে উন্নতি দেখা যায়।

কিন্তু এই গবেষণা থেকে বলা যায় না যে কালোজিরা ও মধু একসঙ্গে খেলে পুরুষের যৌনশক্তি বা যৌনক্ষমতা নিশ্চিতভাবে বেড়ে যাবে।

বিশেষ করে ইরেকটাইল ডিসফাংশন বা যৌন দুর্বলতার চিকিৎসা হিসেবে কালোজিরা-মধুকে প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসা বলা যায় না। এ ধরনের সমস্যার পেছনে ডায়াবেটিস, হৃদ্‌রোগ, হরমোনের সমস্যা, মানসিক চাপ, ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াসহ বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে।

অর্থাৎ, কালোজিরা-মধুকে যৌনশক্তি বৃদ্ধির নিশ্চিত প্রাকৃতিক ওষুধ বলা বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়।

কারা পরিমিত পরিমাণে খেতে পারেন?

সাধারণভাবে সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তি খাবারের অংশ হিসেবে পরিমিত পরিমাণে কালোজিরা ও মধু গ্রহণ করতে পারেন। তবে কোনো নির্দিষ্ট রোগের চিকিৎসার উদ্দেশ্যে বেশি পরিমাণে কালোজিরার তেল, নির্যাস বা সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া ভালো।

বিশেষ করে যারা নিয়মিত ওষুধ খান, তাদের ক্ষেত্রে ভেষজ উপাদান ব্যবহারের আগে সতর্ক হওয়া প্রয়োজন। কালোজিরা নিয়ে গবেষণায় রক্তে শর্করা, রক্তচাপ ও অন্যান্য বিপাকীয় সূচকের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব পাওয়া গেছে।

কারা কালোজিরা-মধু খাওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকবেন?

ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তি

মধু রক্তে শর্করা বাড়াতে পারে। তাই ডায়াবেটিস থাকলে মধু কতটা খাওয়া হচ্ছে তা হিসাবের মধ্যে রাখতে হবে। কালোজিরা রক্তে শর্করা কমাতে পারে—এমন গবেষণা থাকলেও সেটি ডায়াবেটিসের ওষুধের বিকল্প নয়।

যারা নিয়মিত ওষুধ খান

কালোজিরার বিভিন্ন সক্রিয় উপাদান শরীরের বিপাকীয় প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলতে পারে। তাই নিয়মিত ওষুধ গ্রহণকারীদের বিশেষ করে বেশি মাত্রায় কালোজিরার তেল বা সাপ্লিমেন্ট নেওয়ার আগে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। ভেষজ পণ্য ও ওষুধের পারস্পরিক প্রভাবের বিষয়টিও বিবেচনা করা প্রয়োজন।

যাদের মধুতে অ্যালার্জি আছে

মধু কিছু মানুষের অ্যালার্জির কারণ হতে পারে। অ্যালার্জির ইতিহাস থাকলে মধু খাওয়ার ব্যাপারে সতর্ক থাকা উচিত।

এক বছরের কম বয়সী শিশু

এক বছরের কম বয়সী শিশুকে কোনোভাবেই মধু দেওয়া উচিত নয়। মধু থেকে infant botulism নামের বিরল কিন্তু গুরুতর অসুস্থতার ঝুঁকি রয়েছে।

বেশি খেলেই কি বেশি উপকার?

না। কালোজিরা ও মধু—দুটিই প্রাকৃতিক উপাদান হলেও ‘প্রাকৃতিক’ মানেই ইচ্ছেমতো বেশি খাওয়া নিরাপদ—এমন ধারণা ঠিক নয়।

কালোজিরার বিভিন্ন গবেষণায় আলাদা আলাদা মাত্রা, তেল, গুঁড়া বা নির্যাস ব্যবহার করা হয়েছে। তাই গবেষণায় ব্যবহৃত মাত্রাকে সাধারণ মানুষের জন্য দৈনিক নির্দিষ্ট ডোজ হিসেবে ধরে নেওয়া উচিত নয়। কালোজিরা নিয়ে সামগ্রিক গবেষণার মানও একরকম নয়।

অন্যদিকে মধু মূলত চিনি। তাই অতিরিক্ত মধু খেলে বাড়তি ক্যালরি ও চিনি গ্রহণ হয়।

কালোজিরা ও মধু খাওয়ার ক্ষেত্রে মূল কথা

কালোজিরা ও মধু একসঙ্গে খাওয়া সাধারণ খাবারের অংশ হিসেবে অনেকের জন্য গ্রহণযোগ্য হতে পারে। কালোজিরা নিয়ে গবেষণায় রক্তে শর্করা, প্রদাহ ও কিছু বিপাকীয় সূচকে সম্ভাব্য উপকারের ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। মধুরও কিছু সম্ভাব্য স্বাস্থ্যগত বৈশিষ্ট্য রয়েছে। তবে এই দুই উপাদানের সংমিশ্রণকে কোনো রোগের নিশ্চিত চিকিৎসা হিসেবে দেখার মতো যথেষ্ট প্রমাণ নেই।

আর যৌনশক্তি বৃদ্ধির ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—কালোজিরা ও মধু খেলেই যৌনক্ষমতা বাড়বে, এমন শক্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ বর্তমানে নেই। কালোজিরার তেল নিয়ে কিছু গবেষণায় পুরুষের বীর্যের মানের নির্দিষ্ট সূচকে উন্নতি দেখা গেলেও সেটিকে সরাসরি যৌনশক্তি বৃদ্ধির প্রমাণ বলা যায় না।

তাই যৌন দুর্বলতা, ইরেকটাইল ডিসফাংশন বা দীর্ঘদিনের যৌন সমস্যাকে শুধু কালোজিরা-মধু দিয়ে সমাধানের চেষ্টা না করে সমস্যার কারণ নির্ণয় করা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

আল-মামুন/

পাঠকের মতামত:

আপনার জন্য বাছাই করা কিছু নিউজ